বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

ঢাকায় সার্বক্ষণিক একজন ভারতীয় মন্ত্রী!

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৮ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক প্রথা ভেঙে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক নতুন মাত্রার সূচনা করেছে নয়াদিল্লি। সাধারণত ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনের দায়িত্ব পালন করে থাকেন ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের (আইএফএস) দক্ষ ও পেশাদার কূটনীতিকরা। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে ভারত সরকার তাদের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে ৭৬ বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তাকে সরাসরি কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী বা পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন ভারতীয় পূর্ণমন্ত্রী এখন সার্বক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করে দুদেশের সম্পর্ক তদারকি করবেন। ভারতের এই আকস্মিক ও ব্যতিক্রমী কূটনৈতিক চালটি মোটেও অনর্থক বা কাকতালীয় নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং অত্যন্ত সুচিন্তিত এক কৌশলগত হিসাবনিকাশ।

দিনেশ ত্রিবেদী কোনো সাধারণ রাজনীতিক নন; তার রয়েছে এক বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক অতীত। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি জনতা পার্টি, কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস এবং সর্বশেষ ভারতীয় জনতা পার্টিসহ (বিজেপি) ভারতের চারটি প্রধান রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করেছেন। প্রতিটি দলের হয়েই তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রায়শই এমন সব সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যা অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের মূল নীতির সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। মূলত নিজস্ব মতাদর্শ ও স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণেই তাকে চারবার দল পরিবর্তন করতে হয়েছে। এমন একজন স্বাধীনচেতা ও আনপ্রেডিক্টেবল রাজনীতিককে বর্তমানের এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

দিনেশ ত্রিবেদীর এই নিয়োগ এবং তার বাংলাদেশে আগমনের সময়কালটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ভারতের অন্তর্নিহিত কৌশলটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নির্বাচন চলছিল, ঠিক সেই সময়েই তাকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার যে পরিচিতি ও প্রভাব রয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের রাজনীতিতে ফায়দা লোটাই ছিল সেই সময়ের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিন্তু তার ঢাকায় যোগদানের সময়টি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ঠিক এমন এক সময়ে ঢাকায় এসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সফরে রয়েছেন। এই সফরে চীনের সাথে বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ একাধিক মেগা অবকাঠামো ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিবিড় আলোচনা এবং সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।

বাংলাদেশ যখন আঞ্চলিক ভারসাম্যের অংশ হিসেবে কৌশলগতভাবে চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন ভারতের এমন একজন প্রতিনিধি ঢাকায় প্রয়োজন ছিল যার সরাসরি নয়াদিল্লির শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। একজন পেশাদার আমলার পক্ষে অনেক সময় প্রটোকল ভেঙে সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত দিনেশ ত্রিবেদী আমলাতান্ত্রিক জটিলতার তোয়াক্কা না করে সরাসরি ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে দরকষাকষি বা সিদ্ধান্ত আদান-প্রদান করতে পারবেন। বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদের সাথে যেকোনো জটিল ও স্পর্শকাতর দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তার এই রাজনৈতিক ওজন তাকে এক অনন্য সুবিধা এনে দেবে। ভারত সরকার মূলত এই নিয়োগের মাধ্যমে ঢাকাকে একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা দিতে চাইছে যে, তারা বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ স্তরের গুরুত্ব দিচ্ছে এবং সরাসরি রাজনৈতিক চ্যানেলে সব সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী।

দিনেশ ত্রিবেদীকে বেছে নেওয়ার পেছনে তার ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক পটভূমিও একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তার আদি নিবাস পাকিস্তানে হলেও তিনি দীর্ঘদিন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেছেন। এর ফলে তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে অনর্গল বাংলায় কথা বলতে পারেন। ভাষা ও সংস্কৃতির এই নৈকট্য তাকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে সহজে মিশে যাওয়ার সুযোগ করে দেবে। একই সাথে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলের জটিল রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক সমীকরণগুলো সম্পর্কে তার গভীর বোঝাপড়া রয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনাররা ঐতিহ্যগতভাবে শুধু ক্ষমতাসীন সরকারের সাথেই নয়, বরং অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথেও গভীর যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। দিনেশ ত্রিবেদী তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাবলীল যোগাযোগের দক্ষতা দিয়ে এই কাজটি অন্যান্য যেকোনো কূটনীতিকের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে করতে পারবেন বলে নয়াদিল্লি বিশ্বাস করে।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই এই প্রবীণ রাজনীতিক তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার এক বড় প্রমাণ রেখেছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করার পরপরই তিনি অন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতায় না গিয়ে সরাসরি ঢাকার ভারতীয় ভিসা সেন্টারে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে তিনি এক যুগান্তকারী ঘোষণা দেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর ধরে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধ ছিল। দিনেশ ত্রিবেদী ঘোষণা করেন যে, দুই দিন আগে অর্থাৎ ২৬ জুন ২০২৬ তারিখ থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাস ও দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করতে তার এই পদক্ষেপ একটি মাস্টারস্ট্রোক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ‘পিপল টু পিপল কানেক্টিভিটি’ বা জনযোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলানোর এই উদ্যোগটি তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতারই পরিচায়ক।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি ভারতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। ভারতের স্পষ্ট অবস্থান হলো, তিস্তা বা বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের কোনো ধরনের সরাসরি সম্পৃক্ততা তারা সমর্থন করে না। এখন যেহেতু বেইজিংয়ের সাথে সমঝোতা স্মারক সই হয়েই গেছে, তাই বাংলাদেশ ও চীন আগামী দিনগুলোতে এই প্রকল্প নিয়ে কীভাবে অগ্রসর হয়, সেদিকে ভারত তীক্ষ্ণ ও সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। এই জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন ঝানু রাজনীতিককে দিয়ে ভারত মূলত তাদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টাই চালাবে।

সবশেষে দিনেশ ত্রিবেদীর প্রটোকলগত দিকটিও আলোচনা করা প্রয়োজন। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক আদেশ অনুযায়ী, তাকে দেওয়া ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদমর্যাদাটি মূলত একটি ব্যক্তিগত মানদণ্ড। এর সহজ অর্থ হলো, তিনি যখন ভারতের মাটিতে কোনো রাষ্ট্রীয় বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কিংবা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন, তখন তাকে একজন সাধারণ রাষ্ট্রদূতের ঊর্ধ্বে গিয়ে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমমর্যাদায় সম্মান ও আসন দেওয়া হবে। তবে বাংলাদেশের মাটিতে তার আনুষ্ঠানিক পদবি, কূটনৈতিক দায়িত্ব এবং প্রটোকল একটি সাধারণ হাইকমিশনের আইনি কাঠামোর ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তারপরও তার এই বিশেষ পদমর্যাদা এবং ঢাকায় তার প্রথম দিনের অভাবনীয় পদক্ষেপ এরই মধ্যে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চারবার দলবদল করা এবং নিজস্ব খেয়ালে চলা এই রাজনীতিক আগামী দিনগুলোতে ঢাকায় বসে নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দেন, নাকি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...