বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

৫০০-১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাবে সংসদে নতুন বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৩ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬

জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে হঠাৎ করেই এক অভূতপূর্ব এবং চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। রোববার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলে দেওয়ার মতো এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় দাবি তুলেছেন, দেশের বাজার থেকে চলতি ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়া হোক। তার এই আকস্মিক ও নাটকীয় প্রস্তাবের পর সংসদ থেকে শুরু করে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা ও বিতর্ক। অনেকেই এই প্রস্তাবকে কালো টাকা উদ্ধারের একটি মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকেই এর সম্ভাব্য ভয়ংকর অর্থনৈতিক পরিণতির কথা ভেবে আঁতকে উঠছেন। প্রস্তাবটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং কালো টাকার বিস্তার রোধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি দীর্ঘদিনের।

ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন তার এই প্রস্তাবের সপক্ষে বেশ কিছু জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লাগামহীন দুর্নীতির মাধ্যমে যারা বিপুল পরিমাণ অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন, তাদের সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য বড় নোট বাতিলের কোনো বিকল্প নেই। তিনি মনে করেন, দুর্নীতিবাজদের একটি বড় অংশ তাদের অবৈধ অর্থ ব্যাংকে না রেখে নিজেদের ঘরেই নগদ আকারে মজুত করে রেখেছেন। এছাড়া, দেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে যারা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ জমিয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তারাও এই অর্থ দেশে ফেলে গেছেন। ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করা হলে এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা এক নিমেষেই মূল্যহীন কাগজে পরিণত হবে। এর মাধ্যমে মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার কঠোরভাবে দমন করা সম্ভব হবে এবং দেশে কালো টাকার প্রধান উৎসগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে বলে তিনি জোরালো দাবি জানান।

এই সাহসী ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপের সম্ভাব্য ইতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরেছেন এই সংসদ সদস্য। তার মতে, সরকার যদি অবিলম্বে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের এই ছক বাস্তবায়ন করে, তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক নতুন গতির সঞ্চার হতে পারে। কালো টাকার মালিকরা যখন বাধ্য হয়ে তাদের লুকানো অর্থ বদলানোর জন্য ব্যাংকের দ্বারস্থ হবেন, তখন সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং খাতের মূল ধারায় প্রবেশ করবে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের যে তারল্য সংকট রয়েছে, তা নিমেষেই কেটে যাবে এবং ব্যাংকের অর্থ সরবরাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ যখন সরকারি কোষাগারে বা ব্যাংকিং চ্যানেলে আসবে, তখন তা জাতীয় বাজেটের বিশাল ঘাটতি মেটাতেও অভাবনীয় ভূমিকা রাখবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই অর্থ পরবর্তীতে দেশের বিনিয়োগ এবং উৎপাদনমুখী বিভিন্ন খাতে ব্যবহার করার নতুন রাস্তা উন্মুক্ত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

বড় নোট বাতিলের পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বেহাল দশা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতির ওপরও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যারিস্টার খোকন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, দেশের অর্থনীতির আকার ও বাস্তব প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি সংখ্যক ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খোলার যে একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তিনি তার কড়া সমালোচনা করেন। তার মতে, দেশে এমন একটি ভ্রান্ত ও ক্ষতিকর সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে যেখানে কেউ সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হলেই তার একটি নিজস্ব ব্যাংক চাই, অথবা কোনো বড় নেতা হলেই তার একটি লিজিং কোম্পানির মালিকানা চাই। অর্থনীতির নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক পরিচয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলের এই হীন সংস্কৃতি দেশের আর্থিক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তাই তিনি অবিলম্বে এই ধরনের রাজনৈতিক ব্যাংক প্রদান এবং আর্থিক খাতের এই নৈরাজ্যকর সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করার জন্য সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তবে সংসদে উত্থাপিত এই প্রস্তাবের সাথে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের একটি ভয়ংকর অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার হুবহু মিল খুঁজে পাচ্ছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বরের কথা, যেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঠিক এভাবেই রাতারাতি দেশের বাজার থেকে ৫০০ এবং ১০০০ রুপির নোট বাতিলের এক নাটকীয় ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সময় ভারতের বাজারে প্রচলিত মোট নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশই ছিল এই বড় দুটি নোটের দখলে। মোদির সেই নোটবন্দি নীতির প্রাথমিক উদ্দেশ্যও ছিল কালো টাকা এবং জাল নোটের বিস্তার রোধ করা। কিন্তু এর ফলাফল ভারতের অর্থনীতির জন্য আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। নোট বাতিলের সেই আকস্মিক ধাক্কায় ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির দেশ রীতিমতো থমকে দাঁড়িয়েছিল, যার রেশ দেশটির অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে টানতে হয়েছে।

ভারতের সেই নোটবন্দির পরিসংখ্যানগত ফলাফল ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। নোট বাতিলের এই ঘোষণার ঠিক আগে ভারতের জিডিপি বা মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৯ শতাংশের ওপরে। কিন্তু এই ঘোষণার জেরে পরের বছরের মার্চ প্রান্তিকে সেই প্রবৃদ্ধির হার ধসে গিয়ে সরাসরি ৬ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের চুলচেরা হিসাবে দেখা গেছে, শুধুমাত্র এই অপরিকল্পিত নোটবন্দির কারণেই ভারতের অর্থনীতি তার সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির প্রায় এক থেকে দেড় শতাংশ পয়েন্ট চিরতরে হারিয়েছিল। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছিলেন প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়ী এবং দিনমজুররা। নগদ অর্থের তীব্র অভাবে ভারতের বিশাল অসংগঠিত খাত একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়েছিল। কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া—সবকিছুই নগদ অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজেদের জমানো বৈধ টাকা বদলানোর জন্য সাধারণ মানুষকে দিনের পর দিন ব্যাংকের সামনে মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যে অবর্ণনীয় ভোগান্তি ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছিল, সেই অমানবিক দৃশ্য আজও কেউ ভুলতে পারেনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামো, ব্যাংকিং খাতের পরিধি এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা ভারতের তুলনায় বেশ আলাদা হলেও, এই ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্তের অন্তর্নিহিত ঝুঁকিগুলো প্রায় একই রকম। বাংলাদেশের অর্থনীতিও অনেকাংশে অসংগঠিত খাত এবং নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। যদি দেশে হঠাৎ করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের মতো কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, তবে তার প্রথম ও প্রধান ধাক্কা এসে পড়বে দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। তাদের কাছে থাকা অল্প কিছু বৈধ জমানো টাকা বদলাতেও তাদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হবে, যা জনজীবনে এক চরম নৈরাজ্যের সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, যাদের লক্ষ্য করে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেই রাঘববোয়াল কালো টাকার মালিকরা যে সত্যি সত্যিই নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে টাকা বদলাতে সাধারণ মানুষের মতো লাইনে এসে দাঁড়াবেন, এমনটা ভাবার কোনো বাস্তবসম্মত কারণ নেই। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, তারা বরাবরই আইনের ফাঁকফোকর গলে অন্য কোনো অবৈধ পথে নিজেদের অর্থ বৈধ করে নেওয়ার উপায় খুঁজে বের করেন।

সাধারণ মানুষের হাতে থাকা বৈধ টাকা আটকে যাওয়ার এই শঙ্কার বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা বা হিসাব-নিকাশ কেউই উপস্থাপন করেননি। এ কথা সত্য যে, প্রস্তাবটি এখনো কেবল জাতীয় সংসদের ফ্লোরে একজন সদস্যের ব্যক্তিগত দাবি বা প্রস্তাব হিসেবেই উত্থাপিত হয়েছে মাত্র। সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রকার ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি। তবে ভারতের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে এই জ্বলন্ত শিক্ষাই রেখে গেছে যে, কালো টাকা দমনের নামে এমন কোনো হঠকারী বা আকস্মিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে, চূড়ান্ত বিচারে তার সবচেয়ে চড়া মাশুল গুনতে হয় দেশের নিরীহ ও সাধারণ মানুষকেই। তাই দেশের নীতিনির্ধারকদের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এর বহুমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সাধারণ জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...