জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে শনিবার এক অভাবনীয় ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মাদক চোরাচালান ইস্যু নিয়ে সংসদে রীতিমতো বোমা ফাটিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল নিশানায় ছিলেন খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। দেশে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন এবং তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ব্যর্থতা নিয়ে অত্যন্ত কড়া সমালোচনা করেন তিনি। বিশেষ করে কক্সবাজার ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ অন্যান্য মরণঘাতী মাদকের অবাধ প্রবেশ নিয়ে তিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে আঙুল তোলেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় অত্যন্ত জোরালো ভাষায় জানতে চান, আগের চিহ্নিত গডফাদাররা কারাগারে বন্দি থাকার পরও কীভাবে এই মাদকের চালান দেশে অনবরত ঢুকছে এবং বর্তমানে এই বিশাল মাদক সাম্রাজ্যের হাল নতুন করে কে বা কারা ধরেছে। তার এই তীর্যক বক্তব্য জাতীয় রাজনীতি, সংসদ এবং জনপরিসরে নতুন করে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সংসদে দেওয়া এই সাহসী ও স্পষ্ট বক্তব্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, শুধুমাত্র সংসদে বসে কড়া কড়া আইন পাস করলেই দেশ থেকে মাদক পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাবে না। একটি কঠিন আইনকে সত্যিকার অর্থে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করতে হলে যে সৎ সাহস, প্রশাসনিক দৃঢ়তা এবং সর্বোপরি আন্তরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রয়োজন, বর্তমান প্রশাসনের তা চরমভাবে অনুপস্থিত। তিনি উদাহরণ হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির প্রসঙ্গ টেনে আনেন। দেশব্যাপী ইয়াবার অন্যতম গডফাদার হিসেবে বহুল পরিচিত কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের এই সাবেক সংসদ সদস্য বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গয়েশ্বর রায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, অতীতে মানুষের মুখে মুখে শোনা যেত বদির মাধ্যমে দেশে মাদক আসে, কিন্তু এখন তো সেই বদি রাজনৈতিক ও দৃশ্যমান পরিমণ্ডলে নেই। তাহলে টেকনাফ সীমান্তের এই অন্ধকার জগতের নতুন দায়িত্ব কে নিজের কাঁধে নিয়েছে? যেহেতু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ নিজেও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য, তাই গয়েশ্বর রায় কটাক্ষ করে বলেন যে, বাড়ির আশপাশের এই নতুন মাদক কারবারিদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর খুব ভালো করেই চেনার কথা। তার মতে, এতদিন এই সীমান্ত দিয়ে মাদকের স্রোত পুরোপুরি বন্ধ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু বাস্তবে তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তি একেবারেই অমূলক নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা মাদক কারবারিদের একটি তালিকায় কক্সবাজার জেলার শত শত ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান ঘাটলে একটি বিস্ময়কর ব্যাপার চোখে পড়ে, এই তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৭৩ জন ইয়াবা গডফাদারের মধ্যে ৬৫ জনেরই বসবাস টেকনাফ এলাকায়। তবে স্থানীয় সূত্র, গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান বলছে, সরকারি এই তালিকার বাইরেও গত কয়েক বছরে সম্পূর্ণ নতুন এবং আরও বেশি সুসংগঠিত অনেকগুলো চক্র মাদক ব্যবসায় শক্তভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এই নতুন কারবারিদের বিশাল একটি অংশ এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির সম্পূর্ণ বাইরে রয়ে গেছে। আবদুর রহমান বদি যখন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, তখন মনে করা হতো তাকে আইনের আওতায় আনা গেলে মাদকের সরবরাহ হয়তো অনেকটাই ভেঙে পড়বে। কিন্তু তার কারাবাসের পরও ইয়াবা এবং ক্রিস্টাল মেথের মতো ভয়ংকর মাদকের সরবরাহ শৃঙ্খল থেমে নেই। বরং নতুন প্রজন্মের গডফাদাররা আরও সূক্ষ্ম ও আধুনিক কৌশলে তাদের এই অবৈধ সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে মোট ২৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম, লামা এবং থানচি উপজেলা জুড়ে রয়েছে ১৮৭ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি স্থলসীমান্ত। অপরদিকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার সাথে মিয়ানমারের রয়েছে ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ জলসীমা। এই জলসীমার প্রাণকেন্দ্র হলো নাফ নদী। নাফ নদীর ঠিক ওপারেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অত্যন্ত সুরক্ষিত পরিবেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় মাদক তৈরির কারখানা। ভৌগোলিক এই নৈকট্য এবং দুর্গম পাহাড়ি ও নদীপথের সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা নিত্যনতুন কৌশলে মাদকের চালান বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, পাচারকারীরা বর্তমানে অর্ধশতাধিক গোপন রুট ব্যবহার করে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করাচ্ছে। নাফ নদীর বুক চিরে, দুর্গম পাহাড়ি পথ, ছোট-বড় ছড়া, উপকূলীয় এলাকা এবং সাধারণ মাছ ধরার ট্রলারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অত্যন্ত সুসংগঠিত সিন্ডিকেটগুলো মাদকের এই বিশাল চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বিঘ্নে পৌঁছে দিচ্ছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ সদর, বাহারছড়া, হ্নীলা এবং হোয়াইক্যং ইউনিয়নের অসংখ্য পয়েন্ট দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের অত্যন্ত নিরাপদ করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
মাদক পাচারের এই চলমান ভয়াবহতার মধ্যে সম্প্রতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে তথ্যটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এসেছে, তা হলো এতে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সরাসরি সম্পৃক্ততা। গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক মাদক কারবারিকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, বর্তমানে আরাকান আর্মির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশে ইয়াবার বড় বড় চালান প্রবেশ করছে। এই মাদকের আর্থিক লেনদেনের ধরনও সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেছে। সাধারণত অবৈধ হুন্ডির মাধ্যমে ইয়াবার বিপুল অংকের মূল্য পরিশোধ করা হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রে অর্থের বদলে বাংলাদেশ থেকে চোরাই পথে জীবনরক্ষাকারী ঔষধ, বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মিয়ানমারে পাচার করে মাদকের মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। এটি দেশের অর্থনীতি এবং জননিরাপত্তা উভয়ের জন্যই এক চরম অশনিসংকেত। দ্রুত বিপুল লাভের প্রলোভন, প্রভাবশালীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং সীমান্তবর্তী জনপদের আর্থসামাজিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে এই আন্তঃদেশীয় মাদক বাণিজ্য অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলছে।
মাদকের এই অব্যাহত ও অবাধ প্রবাহের বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সংসদে ও জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানামুখী প্রশ্ন উঠেছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) রামু সেক্টর কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় টহল, নজরদারি এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বহুগুণ জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ কোস্টগার্ডও জলসীমা ও উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত ও ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করছে। বিজিবির পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, চলতি বছরে মাদক উদ্ধারের পরিমাণ অতীতের অনেক রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। মাদকবিরোধী এসব ধারাবাহিক অভিযানে প্রায় প্রতিদিনই লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ অন্যান্য ভয়ংকর মাদক উদ্ধার হচ্ছে এবং অসংখ্য বাহককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জালে মূলত মাঠপর্যায়ের সাধারণ বাহক বা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করা খুচরা কারবারিরাই ধরা পড়ছে। যারা নেপথ্যে থেকে কোটি কোটি টাকার এই অবৈধ ব্যবসার মূল কলকাঠি নাড়ছে, সেই প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক এবং মূল হোতারা সব সময়ই পর্দার আড়ালে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কক্সবাজারের স্থানীয় বিশিষ্টজন, সচেতন নাগরিক সমাজ এবং জনপ্রতিনিধিদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই শীর্ষ গডফাদারদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শুধুমাত্র সাধারণ চুনোপুঁটিদের গ্রেপ্তার করে বা কিছু চালান আটক করে এই মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ কখনোই পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। একটি পাচার রুট বন্ধ হলে এই বিশাল সিন্ডিকেট মুহূর্তের মধ্যে বিকল্প অন্য কোনো রুট তৈরি করে নিচ্ছে। তাই গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক সততার কোনো বিকল্প নেই। আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিয়ে প্রভাবশালীদের বলয় ভাঙতে পারলেই কেবল মাদকের এই ভয়াল থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪