শিরোনামঃ
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার আগে: ১০টি পরামর্শ ডাকলেই কাছে চলে আসবে টয়লেট! মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী রাজনীতিবিদদের ভুল তুলে ধরা সাংবাদিকদের দায়িত্ব: মির্জা ফখরুল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন বিদেশি অতিথি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা তেহরানে গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করলেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এলপিজির দাম কমেছে, ধাপে ধাপে জ্বালানি তেলও কমানো হবে: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ফুটবল দর্শনে দেশীয় ফুটবলের রূপান্তর পরিকল্পনা সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালী অপহরণ মামলায় সাবেক এএসপি গ্রেপ্তার তেহরানে খামেনির জানাজায় রেকর্ড জনসমাগমের আশা
শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

মোংলা ও আনোয়ারায় চীনের বিলিয়ন ডলারের মহাযজ্ঞ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম পরাশক্তি চীনের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক নতুন এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় মোড় নিয়েছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই বৈশ্বিক উৎপাদন খাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু চীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ বাজারকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। দীর্ঘদিনের নানা প্রশাসনিক আলোচনা ও পরিকল্পনা বিভিন্ন সময় স্তিমিত হয়ে পড়লেও, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফল বেইজিং সফর সেই সমস্ত স্থবিরতা কাটিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে একের পর এক মেগা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ঝিমিয়ে পড়া প্রকল্পগুলোতে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়েছে। এই দ্বিপাক্ষিক মৈত্রীর সুবাদে বাংলাদেশে আসতে চলেছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সরাসরি চীনা বিনিয়োগ (FDI), যা দেশের উৎপাদন খাতকে বদলে দেওয়ার পাশাপাশি লাখো তরুণের কর্মসংস্থানের এক বিশাল দুয়ার উন্মোচন করতে যাচ্ছে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের এই শিল্প ও বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের ইতিহাস অবশ্য বেশ পুরোনো। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে প্রথম একটি বিশেষায়িত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঐতিহাসিক ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তিও সম্পন্ন হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, জমি অধিগ্রহণের পর বারবার নকশা পরিবর্তন, অর্থায়নের চরম সংকট এবং ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ নানা টানাপোড়েনে বছরের পর বছর সেই স্বপ্নের প্রকল্পগুলো ফাইলবন্দি হয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণী প্রজ্ঞা এবং বেইজিং সফরের পর সেই অচল অবস্থা সম্পূর্ণ কেটে গেছে।

এই বিশাল ও বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে দেশের অত্যন্ত কৌশলগত দুটি অঞ্চল—একটি চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং অন্যটি বাগেরহাটের মোংলা। গত ১৬ই জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে অবস্থিত আনোয়ারায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এক বিশাল আধুনিক শিল্পনগরী। পাশে কর্ণফুলী চ্যানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকায় ভৌগোলিক দিক থেকে এই অঞ্চলটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য একটি সোনায় সোহাগা অবস্থানে রয়েছে। এই বিশেষ শিল্পাঞ্চলে উচ্চমানের তৈরি পোশাক ও বিশ্বমানের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির পাশাপাশি মোবাইল ফোন, উন্নত মানের লাইটিং ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আধুনিক মেডিকেল ডিভাইস তৈরির মতো বড় বড় কারখানা স্থাপিত হতে যাচ্ছে। সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী, আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলে দেশের প্রায় এক লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

একইভাবে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে গড়ে উঠছে ‘চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল’। উল্লেখ্য, এই বিশেষ অঞ্চলটি আগে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে ভারতীয় কোম্পানিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই বরাদ্দ বাতিল করে তা দিল্লির কাছ থেকে ফিরিয়ে নেয়। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্বার্থে এটি চীনের একটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে। বেইজিংয়ের এই শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানটি মোংলায় একটি আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক হাব এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস নির্মাণে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। কেবল এই একটি প্রকল্পেই দেশের প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্রেফ এই দুটি বৃহৎ অঞ্চলের হাত ধরেই দেশের প্রায় দেড় লাখ মানুষের সরাসরি রুটি-রুজির স্থায়ী ব্যবস্থা হচ্ছে। আর সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর পরোক্ষ প্রভাব আরও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। একটি বিশাল শিল্পনগরী বা কারখানাকে সচল রাখতে শুধু কারখানার শ্রমিকই যথেষ্ট নয়; তার সাথে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে পরিবহন খাত, কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং ও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং আবাসন ব্যবসার মতো আরও কত শত উপখাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে থাকে। ফলে এই দুই অঞ্চলে আরও কয়েক লাখ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। প্রতি বছর আমাদের দেশে যে বিপুল সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত তরুণ চাকরির বাজারে এসে উপযুক্ত কাজের অভাবে চরম হতাশায় ভোগেন, তাদের জন্য চীনের এই বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো একটি মস্ত বড় আশার আলো ও লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে।

কেবল চট্টগ্রাম বা মোংলাই নয়, চীনের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও ভারী শিল্প খাতে বিনিয়োগের এক বিশাল ডালা সাজিয়ে বসেছে। দেশের স্থল ও সমুদ্রভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, বর্জ্য থেকে অত্যাধুনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি প্রস্তুত এবং রেলওয়ের জন্য উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ তৈরির মতো প্রায় ১১টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল খাতে ৯ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাবনা নিয়ে কাজ করছে বেইজিং। এমনকি ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জেও নতুন নতুন ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা গড়তে চীনা মূলধন ও প্রযুক্তি আসার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে বিচার করলে স্পষ্ট হয় যে, চীন কেন হঠাৎ বাংলাদেশের ওপর এত বড় ভরসা রাখছে। বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলমান তীব্র বাণিজ্য যুদ্ধের এই যুগে চীনের বড় বড় কোম্পানিগুলো উৎপাদন খরচ এবং লজিস্টিকস ব্যয় কমাতে নতুন ও নিরাপদ ভৌগোলিক চারণভূমি খুঁজছিল। বাংলাদেশ তাদের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য হয়ে উঠেছে কারণ এখানে রয়েছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও দক্ষ শ্রমশক্তি, বিশাল এক অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকে ব্যবহার করার অনন্য ভৌগোলিক সুবিধা। বর্তমান সরকারও এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত লাল গালিচা সংবর্ধনা দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বিশেষ ‘চায়না রিলেশনশিপ ডেস্ক’ এবং ওয়ান-স্টপ সেবার জন্য অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে।

তবে মুদ্রার অপর পিঠের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকেও আমাদের সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। খাতা-কলমে বা দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকে কোটি কোটি ডলারের হিসাব দেখতে ও শুনতে বেশ চমৎকার লাগলেও, অতীতের মতো আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি বা দুর্নীতির কারণে এই মেগা প্রকল্পগুলো যেন আবারও মুখ থুবড়ে না পড়ে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। এই কূটনৈতিক সাফল্যের আসল পরীক্ষাটি হবে মাঠপর্যায়ে প্রকল্পগুলোর শতভাগ সফল ও দ্রুত বাস্তবায়নে। চীনা কোম্পানিগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কাঙ্ক্ষিত সড়ক ও বন্দর অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষিত তরুণদের এই আধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তির কারখানার উপযোগী করে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই হবে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। এই অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জগুলো যদি বাংলাদেশ সফলভাবে অতিক্রম করতে পারে, তবে চট্টগ্রাম ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে উঠবে জাতীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ তখন শুধু সস্তা দরের তৈরি পোশাকের দেশ হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক উৎপাদন ও বৈচিত্র্যময় সরবরাহ ব্যবস্থার এক অপরিহার্য ও গর্বিত অংশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...