রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৩ অপরাহ্ন

বিপজ্জনক আর্থিক ঝুঁকিতে ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান নীতিগত ত্রুটি, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের বড় একটি অংশের রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রস্তুতকৃত ‘আর্থিক ঝুঁকি বিবৃতি’র এক বিশেষ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের অন্তত ১২২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বর্তমানে তীব্র আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে নিমজ্জিত। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসান ও দায়ের কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে। অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর নতুন করে কোনো সমন্বিত ঝুঁকি নিরূপণ করা না হলেও, গত দুই বছরে এই দায়ের পরিমাণ বাস্তবিক অর্থে ১০ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প উৎপাদন এবং বিমান পরিবহন খাতের কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা এখন সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশদ মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিশাল অংকের মোট দায়ের মধ্যে একটি বড় অংশই রয়েছে খোদ সরকারের কাছে বকেয়া হিসেবে। স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) অনুকূলে নেওয়া ‘সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসএলএ) এবং সাধারণ ‘লোন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এলএ)-এর শর্তাধীনে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বকেয়া দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা সামগ্রিক দায়ের প্রায় ৪২ দশমিক ০১ শতাংশ। এর বাইরেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৪ অর্থবছরে এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট প্রচ্ছন্ন দায়ের (কন্টিনজেন্ট লায়াবিলিটি) পরিমাণ রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। মূলত সুশাসনের অভাব এবং দুর্বল ব্যবসায়িক কাঠামোর কারণে এই সংস্থাগুলো নিজেদের পরিচালন ব্যয় তোলার পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর এক মস্ত বড় স্থায়ী বোঝা তৈরি করেছে।

ঝুঁকির তীব্রতা এবং গুণগত মান বিবেচনা করে অর্থ মন্ত্রণালয় দেশের এই ১২২টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাকে মূলত পাঁচটি আলাদা ক্যাটাগরিতে বা শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক বা ‘খুব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় রয়েছে ১৫ শতাংশ বা ১৯টি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩০টি সংস্থাকে। মাঝারি মাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান, যার সংখ্যা ৫০টি এবং শতকরা হার ৪১ শতাংশ। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে ১৫ শতাংশ বা ১৮টি প্রতিষ্ঠান এবং একেবারে ‘নূন্যতম বা কম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ ৫টি সরকারি সংস্থাকে। এই শ্রেণিবিন্যাস প্রমাণ করে যে, দেশের সিংহভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই কোনো না কোনো মাত্রায় আর্থিক দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে দিনাতিপাত করছে।

এই বিশাল আর্থিক সংকটের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক জবাবদিহিতার চরম অভাব এবং হিসাবায়নের অস্বচ্ছতা। দেশের কোম্পানিগুলোর হিসাব নিরীক্ষা সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) দেশের মোট ৩৯২টি সরকারি কোম্পানি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, করপোরেশন ও কর্তৃপক্ষকে তাদের যথাযথভাবে অডিট বা নিরীক্ষা করা বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আইনি নির্দেশ দিয়েছিল। তবে প্রচলিত নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এবং আইনি বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠানই তাদের চূড়ান্ত অডিট রিপোর্ট জমা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এফআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধারণা, মূলত অভ্যন্তরীণ আর্থিক হিসাবে বড় ধরনের গরমিল থাকা এবং সঠিকভাবে হিসাব বই রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি শাস্তির ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে। এমনকি অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে থাকা শীর্ষ ১২২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও অনেকে সময়মতো অডিট সম্পন্ন করতে পারেনি।

অর্থ বিভাগের ঝুঁকি বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক মহামারি ও যুদ্ধ-পরবর্তী অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক বহুমুখী সংকট এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই খাতগুলোর বিপর্যয়ের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির কারণে বিভিন্ন সেবা ও শিল্প খাতে সরকারি সেবার সার্বিক চাহিদা বা ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা সরাসরি এই কোম্পানিগুলোর দৈনিক রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের নেতিবাচক আঘাত হেনেছে। দ্বিতীয়ত, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়নের কারণে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন, পরিচালন এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে।

পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের ওপর উচ্চ সুদের হার কার্যকর থাকায় এই দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন করে সহজ শর্তে ক্রেডিট বা ঋণ পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যা তাদের দৈনন্দিন তারল্য সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত করেছে। এছাড়া নীতিগত ও আইনি জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সময়মতো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ট্যারিফ বা মূল্যহার সমন্বয় করা সম্ভব হয় না, যার ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামগ্রিক অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহের ওঠানামাও এই সংকটকে প্রভাবিত করে। শেষ পর্যন্ত এই দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক বোঝা সামাল দিতে সরকারকে জরুরি রাষ্ট্রীয় তহবিল বরাদ্দ করতে হয়, যা প্রকারান্তরে সাধারণ করদাতাদের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ‘বেইল-আউট’ বা অনুদান দেওয়ার শামিল।

অর্থ বিভাগের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান যে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিমান কিংবা ভারী শিল্প খাতের লোকসান যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, তাতে অবিলম্বে বড় ধরনের আইনি ও কাঠামোগত সংস্কার না করলে এই বিশাল অভ্যন্তরীণ দায় পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ৮ দশমিক ৩৩ লাখ কোটি টাকার দায় প্রকারান্তরে জাতীয় বাজেটের বার্ষিক বরাদ্দের ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার যখন নিজের বিশাল ঘাটতি বাজেট মেটাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ঋণ নিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের দায় মেটাতে গিয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মতো অতি প্রয়োজনীয় উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এর বাইরে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশের জন্যই দায়ী এই দুর্বল ও লোকসানি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো, যার ফলে বেসরকারি খাতে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগের গতি থমকে যাচ্ছে।

তবে এই সংকটের মাঝেই দেশের সার্বিক বাহ্যিক অর্থনৈতিক সূচকে কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের জুন মাসের শেষে যেখানে সরকারি খাতের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি ছিল ৯৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০编制৬ সালের মার্চ মাস শেষে তা ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার কমে ৯০ দশমিক nobleman ৯১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এর মধ্যে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৮০ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৯ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সরকারি বৈদেশিক ঋণের প্রধান অংশটিই মূলত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া, যা ২০২৬ সালের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৭৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে।

একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়া সরকারি বন্ডের দায়ের পরিমাণও কমেছে। ২০২৫ সালের জুনে বন্ডের মোট পরিমাণ যেখানে ছিল ৬৬১ মিলিয়ন ডলার, তা মার্চ ২০编制৬-এ ১০০ মিলিয়ন ডলার কমে ৫৬১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বৈদেশিক দায়ও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে এই খাতে মোট বৈদেশিক দায় ছিল ১৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দায় ৮ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি নিজস্ব বৈদেশিক দায় ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিদেশি দায়-দেনা কমানোর ব্যাপারে বিশেষ ও কঠোর নীতিগত অবস্থান নেওয়ার কারণেই এই সরকারি বিদেশী ঋণ ক্রমান্বয়ে কমছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক দায় কমে আসা সামষ্টিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হলেও, অভ্যন্তরীণ বাজারে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ দক্ষতা বৃদ্ধি করা এখনো সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যলেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...