শিরোনামঃ
সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী সন্তানের বয়স ১৮ থেকে ২৪: বাবা-মায়ের জন্য ১০টি পরামর্শ শিশু ইরা মনি হত্যা মামলার রায় পেছাল সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সংকেত বহাল সারাদেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: তথ্য উপদেষ্টা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন স্পেনের কাছে হারের পর পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজের পদত্যাগ চিকিৎসাকে বিশেষ সুবিধা নয় অধিকার ভাবার আহ্বান জুবাইদা রহমানের
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ন

ক্যাডেট কলেজের আদলে সরকারি মেগা শিক্ষা প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে সরকার। দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে ক্যাডেট কলেজের আদলে সম্পূর্ণ আবাসিক মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। ‘নির্বাচিত এলাকাসমূহে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ নির্মাণ প্রকল্প’ শীর্ষক এই উদ্যোগের আওতায় প্রতিটি আসনে ছেলেদের জন্য একটি এবং মেয়েদের জন্য একটি করে আধুনিক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম রেখে প্রস্তাবিত এই আবাসিক প্রকল্পটির প্রাক্কলিত প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই বিপুল ব্যয়ের একটি বড় অংশ সংস্থানের জন্য বৈদেশিক ঋণসহায়তা নেওয়ার বিষয়েও সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনা চলমান রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে পুরোপুরি আবাসিক কোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই, কেবল কিছু পুরোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমিত আকারে ছাত্রাবাস সুবিধা চালু রয়েছে। অন্যদিকে, দেশে বর্তমানে ১২টি ক্যাডেট কলেজ সচল রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি ছেলেদের এবং ৩টি মেয়েদের জন্য নির্ধারিত। ক্যাডেট কলেজগুলোতে সাধারণত সপ্তম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত আবাসিক শিক্ষা দেওয়া হলেও সরকারের নতুন এই প্রকল্পে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই মেধা বিকাশের সুযোগ রাখা হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) প্রস্তাবনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় তিন একর করে জমির প্রয়োজন হবে এবং কেবল জমি অধিগ্রহণ খাতেই সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া, প্রকল্পের অধীনে প্রতিটি ১০ তলাবিশিষ্ট ৬০০টি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণে ২৪ হাজার কোটি টাকা এবং ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসন সুবিধার্থে ৬০০টি হোস্টেল নির্মাণে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই স্কুলগুলোতে ৬০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ল্যাব স্থাপনের জন্য আরও ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সরকারের এই বৃহৎ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উচ্চমানের ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলা, যাতে দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ পায়। তথ্যমতে, দেশের সব অঞ্চলে, বিশেষ করে গ্রামীণ, অনগ্রসর ও অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোতে এখনো আধুনিক ও সমমানের শিক্ষাসুবিধা পৌঁছায়নি। বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক ও ভৌগোলিক বৈষম্য দূর করতে এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে এই আবাসিক মডেল স্কুলগুলো প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ জানিয়েছেন, পিছিয়ে থাকা এলাকার শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষার আওতায় আনাই এর মূল লক্ষ্য, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের বিশাল ব্যয়, এর প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্যতা এবং দেশের বিদ্যমান স্কুলগুলোর সার্বিক উন্নয়নের বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করা হবে।

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ সরকারিভাবে এমন আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের স্বল্প ও সীমিত আয়ের পরিবারের মেধাবী সন্তানেরা সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় মানসম্পন্ন আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার এক অভূতপূর্ব সুযোগ পাবে। তবে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে একটি সুনির্দিষ্ট ‘স্কুল ম্যাপিং’ বা এলাকাভিত্তিক সমীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। সব এলাকায় ঢালাওভাবে আবাসিক স্কুল না বানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জের মতো দুর্গম হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল কিংবা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবঞ্চিত ও জনবহুল এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করে যদি এই পরিকল্পিত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়, তবেই এর প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব।

একই সাথে, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অতীতের কিছু ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে দেশে মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সঠিক তদারকি, শিক্ষকসংকট এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে ৯৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অনুমোদিত ১৫ হাজার ২৯৩টি সহকারী শিক্ষকের পদের মধ্যে ২ হাজার ৮৪২টি পদই শূন্য, যা মোট পদের ১৮ শতাংশের বেশি। মাউশির নিজস্ব পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার গবেষণায় দেখা গেছে, মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি, গণিত এবং এমনকি মাতৃভাষা বাংলায়ও কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। শ্রেণিকক্ষে যথাযথ পঠন-পাঠন না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোচিং ও গৃহশিক্ষকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক খরচের বোঝা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের মোট শিক্ষা ব্যয়ের ৭১ শতাংশই সরাসরি বহন করতে হয় শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারগুলোকে।

এই বাস্তবতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব মোর্শেদ মনে করেন, নতুন কোনো বিশাল ও ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে দেশের বিদ্যমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন, শিখনঘাটতি নিরসন এবং তীব্র শিক্ষকসংকট দূর করা অনেক বেশি জরুরি। সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে বিচ্ছিন্ন কোনো মেগা প্রকল্প না নিয়ে, পুরো শিক্ষা খাতকে সামনে রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা করা উচিত। নতুন এই ৬০০টি মডেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারণাটি চমৎকার হলেও এর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও শুরুতেই নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা আবশ্যক।

 

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...