রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যার চরম অবনতি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিশাল অংশজুড়ে অবিরাম বর্ষণ অব্যাহত রয়েছে, যা জনমনে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত চলমান থাকায় ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া বন্যা পরিস্থিতির আরও মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ গাণিতিক মডেলে দেখা গেছে, এই মুহূর্তে দেশের অন্তত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৪টি বড় নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে, আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে যে, দেশের আকাশজুড়ে শক্তিশালী মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী আরও বেশ কিছুদিন ধরে দেশজুড়ে এই ধরণের টানা ও দমকা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এমন বৈরী প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন জনপদে ইতিমধ্যে যে ভয়াবহ বন্যা চলছে, তা আরও কতখানি বিপর্যয়কর রূপ নেবে, তা নিয়ে উপদ্বুত এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এক চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে দেশের বন্যা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র মূল্যায়ন করতে গিয়ে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু সুনির্দিষ্ট এলাকায় পানি কমার ধীরগতির আশা থাকলেও দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং রংপুর অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি পদক্ষেপের ঘোষণা এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ইতিমধ্যে দেশের সব জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সব মানুষের পাশে দাঁড়ায় এবং দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এই অবিরাম বর্ষণে দেশের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক বন্যা ও পাহাড়ধসের মতো বড় বিপর্যয় ঘটেছে।

সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলা বান্দরবানে প্রলয়ঙ্কারী বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর ওপর অতিভারী বর্ষণের কারণে অদূর ভবিষ্যতে ফেনী অঞ্চলেও নতুন করে বন্যা দেখা দেওয়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের দোহাজারী পয়েন্টে সাঙ্গু নদী, হবিগঞ্জ জেলায় খোয়াই নদী, মৌলভীবাজারে মনু নদী এবং সুনামগঞ্জ ও সিলেটে কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লোকালয় প্লাবিত করছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা আরও পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বাংলাদেশের সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং এসব অঞ্চল সংলগ্ন ভারতের সীমান্ত এলাকায়, বিশেষ করে মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে রেকর্ড পরিমাণ অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল দেশের নদীগুলোতে আছড়ে পড়বে।

নদীর এই আকস্মিক পানি বৃদ্ধির ফলে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন সমস্ত নিচু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি নতুন বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এমনকি একই সময়ে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার উপকূলীয় ও নদীসংলগ্ন নিচু এলাকাগুলোও সাময়িকভাবে বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এই চরম সংকটের মাঝেও কিছুটা স্বস্তির খবর হলো, একই সময়ে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কিছু অংশের বন্যা পরিস্থিতির ধীর গতিতে উন্নতি লক্ষ্য করা যেতে পারে। অপরদিকে নতুন করে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর এবং ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলের বহু গ্রাম প্লাবিত হয়ে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়ার কারণে সুরমা নদী অববাহিকায় নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা করা হচ্ছে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা শাহ মো. সজিব হোসাইন স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পুরো সিলেট অঞ্চলে আগামী দুই-তিন দিন এই ভারী বৃষ্টির প্রবণতা একই রকম বজায় থাকবে।

পহাড়ি ঢলের এই নতুন আশঙ্কা নিয়ে আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পার্বত্য রাজ্যে অতিভারী বৃষ্টিপাত হলে সেই অতিরিক্ত জলরাশি পাহাড়ি ঢল হয়ে বাংলাদেশের সুরমা, কুশিয়ারা ও তিস্তা নদী অববাহিকায় প্রবেশ করবে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের নদনদীতে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করবে এবং নিচু এলাকাগুলো সাময়িকভাবে পানিতে নিমজ্জিত হবে। তবে আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ কিছুটা আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা চট্টগ্রামের দিকে সামান্য কমলেও ঢাকা থেকে রংপুর বেল্ট পর্যন্ত বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। যেহেতু এখন ভরা বর্ষাকাল এবং মৌসুমি বায়ু পূর্ণ সক্রিয়, তাই বৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং এতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো খারাপ কিছুর আশঙ্কা নেই। আবহাওয়া অফিস আজ রবিবার যে বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে, তাতে বলা হয়েছে যে দেশের পাঁচ বিভাগের কোথাও কোথাও আজ দুপুর থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এছাড়া আগামী পাঁচ দিনের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে দেশের আটটি বিভাগের অধিকাংশ স্থানেই মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির কথা বলা হলেও সপ্তাহের শেষ দিকে বৃষ্টির এই তীব্রতা কিছুটা কমে আসতে পারে।

নদনদীর সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানি কমতে শুরু করলেও গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় গঙ্গা নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে এবং পদ্মার পানি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আগামী দুই দিন পর গঙ্গা-পদ্মার পানি যৌথভাবে আরও বাড়তে পারে। উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, আত্রাই ও দুধকুমার নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে এবং তিস্তা নদী কয়েকটি পয়েন্টে সতর্কসীমার বিপজ্জনক মাত্রার মধ্যে রয়েছে। এমনকি ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও টঙ্গীখাল নদীর পানিও আগামী তিন দিন ধরে বাড়বে, তবে তা বিপদসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হবে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ১৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় রাঙামাটি-বান্দরবান সড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধসে পড়ায় দুই পার্বত্য জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া অতিবৃষ্টির জেরে পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য তিন জেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই প্রাণ হারিয়েছেন ৮ জন। রাঙামাটি জেলার অন্তত ৩৭টি স্থানে বড় ধরণের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে। বান্দরবানের লামা এবং কক্সবাজারের চকরিয়াতেও পাহাড়ধসে বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম ও সংলগ্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা কবলিত মানুষদের দ্রুত উদ্ধার করতে ও ত্রাণ পৌঁছাতে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।


এ জাতীয় আরো খবর...