রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন

তাঁতিদের সরকারি ঋণের ষাট শতাংশই অযোগ্যদের পকেটে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

দেশের হস্তশিল্প ও তাঁত খাতের উন্নয়নে সরকারের নেওয়া একটি বিশেষ প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক নিবিড় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তাঁতিদের মূলধন জোগান এবং তাঁত আধুনিকায়নের উদ্দেশ্যে বরাদ্দকৃত ঋণের সুবিধাভোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশই আসলে এই অর্থ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না। সরকারি অর্থের এমন অপচয় এবং প্রকৃত অংশীজনদের বঞ্চিত করার এই ঘটনাটি দেশের প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল যোগ্যতার অভাবই নয়, বরং আধুনিকায়নের নামে যে মোটর বরাদ্দ করা হয়েছিল, তার প্রায় ৮০ শতাংশই দেওয়া হয়েছে এমন সব তাঁতে যেখানে আগে থেকেই মোটর বসানো ছিল। অর্থাৎ, প্রকৃত আধুনিকায়নের লক্ষ্যটি এখানে সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে।

‘চলতি মূলধন সরবরাহ এবং তাঁত আধুনিকায়ন (২য় সংশোধিত)’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড কর্তৃক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশব্যাপী বাস্তবায়িত হচ্ছিল। সরকারের মোট ১৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটি দেশের ৫৯টি জেলা এবং ৩০৫টি উপজেলার প্রান্তিক তাঁতিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে এর মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখা, কিন্তু আইএমইডির গত ৩০ জুনের প্রতিবেদন বলছে, কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই বিপুল বিনিয়োগের সিংহভাগই তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

আইএমইডি তাদের প্রতিবেদনে ঋণগ্রহীতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তীব্র স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বচ্ছতার চরম অভাবকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে। তাদের মাঠপর্যায়ের তদন্তে দেখা গেছে, প্রকৃত ও সক্ষম তাঁতিদের মাত্র ৪০ শতাংশের কাছে এই সরকারি ঋণ পৌঁছাতে পেরেছে। এই অনিয়মের পেছনে প্রাথমিক তাঁতি সমিতির সভাপতিদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বিতর্কিত, কারণ সুবিধাভোগী নির্বাচনে তাদের সুপারিশের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই সভাপতিরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের আত্মীয়স্বজন, ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিংবা পছন্দের ব্যক্তিদের সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন বা ঘুষের বিনিময়ে অযোগ্যদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এর বাইরে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ এবং স্বোদপ্তর বা প্রকল্পের সদর দপ্তর থেকে আসা বিশেষ সুপারিশও প্রকৃত তাঁতিদের বঞ্চিত করার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

প্রকল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সনাতন পদ্ধতির তাঁতগুলোকে আধুনিক রূপ দেওয়া। এর অধীনে ৬০৬টি ঐতিহ্যবাহী তাঁতে ২-এইচপি (2-HP) ক্ষমতার মোটর স্থাপন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। আইএমইডির পরিদর্শকেরা দেখতে পান, প্রকৃত আধুনিকায়ন করার পরিবর্তে এই ঋণের বড় অংশই দেওয়া হয়েছে এমন সব পাওয়ার লুম বা বিদ্যুৎচালিত তাঁতের মালিকদের, যাদের কারখানায় আগে থেকেই মোটর সচল ছিল। ফলে নতুন করে প্রযুক্তির কোনো উন্নয়ন ঘটেনি, বরং সরকারের টাকা সচল ব্যবসায়ীদের পকেটেই গেছে। তবে এই ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পটির সামগ্রিক ব্যয় এবং ঋণ বিতরণের ভৌত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ। মোট ১৫৮ কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে ১৪৫ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে ৩১,৪০১টি তাঁতের মালিকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে পিট লুম, চিত্তরঞ্জন (আধা-স্বয়ংক্রিয়) লুম, পাওয়ার লুম এবং ঐতিহ্যবাহী জামদানি ও বেনারসি তাঁত অন্তর্ভুক্ত ছিল।

প্রকল্পটির ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সফল হলেও তা আদায়ের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত যেখানে ১১৩ কোটি টাকা ঋণ আদায়ের কথা ছিল, সেখানে মাঠপর্যায়ে আদায় হয়েছে মাত্র ৬১ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৫২ কোটি টাকা বর্তমানে খেলাপি বা বকেয়া হিসেবে আটকে আছে, যা প্রকল্পের স্থায়ী তহবিল বা রিভলভিং ফান্ডের স্থায়িত্বকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। মোট ১১,৯৩৪ জন ঋণগ্রহীতার মধ্যে ৩,৫৫৬ জন তাঁতি ইতিমধ্যে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এর মধ্যে আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২১৪ জন ঋণগ্রহীতা ২০২১ সালে ঋণ পাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত একটি কিস্তিও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেননি। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে বর্তমানে ১৮.৩৬ কোটি টাকার অডিট আপত্তি বা নিরীক্ষা আপত্তি তৈরি হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে ঋণ আদায়ে এই ব্যর্থতার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক ও প্রশাসনিক কারণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ৬ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ বিলম্ব হয়েছে, যার ফলে তাঁতিরা সঠিক সময়ে মূলধন পাননি। দ্বিতীয়ত, কোভিড-১৯ মহামারির অর্থনৈতিক ধাক্কা, সুতা ও রঙের মতো কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে সঠিক মূল্যে বিক্রি করতে না পারার কারণে তাঁতিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এছাড়া ঋণের অর্থের একটি বড় অংশ অপব্যবহার বা ভিন্ন খাতে খরচ করার প্রবণতা দেখা গেছে। প্রায় ১৯.২ শতাংশ সুবিধাভোগী ঋণের টাকা তাঁত শিল্পের উন্নয়নে ব্যবহার না করে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ মেটানো, গবাদি পশু কেনা এবং আগের চড়া সুদের ঋণ পরিশোধের পেছনে ব্যয় করেছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের পর্যাপ্ত জনবল এবং ক্ষুদ্রঋণ পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের অভাব ছিল, কারণ তাদের নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই প্রকল্পের কাজ করতে হয়েছে।

এতসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্ধকারের মধ্যেও প্রকল্পের কারণে অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তাঁতি পরিবারগুলোর গড় বার্ষিক আয় ২০১৮ সালের ১,৭৯,০৪১ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালে ২,০৪,০৩৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে। গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহারকারী পরিবারের হার ৬৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পরিবারগুলোতে পুষ্টিকর খাবার যেমন মাংস, দুধ এবং ডিম খাওয়ার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো নারী সমাজের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। তাঁতি পরিবারের প্রায় ৯২.৭ শতাংশ নারী বর্তমানে সরাসরি বিভিন্ন আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন এবং ৮৫.২ শতাংশ পরিবারে যেকোনো আর্থিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, যা গ্রামীণ সমাজে নারীর মর্যাদা বাড়িয়েছে।

তবে সাময়িক কিছু পারিবারিক উন্নয়ন হলেও সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প বর্তমানে এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, পর্যাপ্ত চলতি মূলধনের তীব্র সংকটের কারণে এই খাতের প্রায় ৭৯ শতাংশ তাঁতই বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। প্রায় ৮৫.৬ শতাংশ তাঁতি জানিয়েছেন যে, বাজারে সুতা ও রঙের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিই তাদের উৎপাদন টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। বাজার ব্যবস্থাও তাঁতিদের অনুকূলে নেই, কারণ ৯৩.৬ শতাংশ তাঁতি মনে করেন যে, মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া এবং বাজার সিন্ডিকেটের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে তারা তাদের কঠোর পরিশ্রমে তৈরি কাপড়ের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। এর ওপর যোগ হয়েছে রপ্তানির নতুন সংকট। ভারতের সাথে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা ও কাপড় রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করায় তাঁতিরা বাধ্য হয়ে সমুদ্রপথ ব্যবহার করছেন। এর ফলে যেখানে আগে এক সপ্তাহেরও কম সময়ে পেমেন্ট বা টাকা পাওয়া যেত, এখন সেখানে দীর্ঘ তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগছে, যা তাদের মূলধনকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে।

বাংলাদেশের তাঁত শিল্প কেবল একটি পেশা নয়, এটি এদেশের অন্যতম প্রাচীন কুটির শিল্প এবং কৃষির পর গ্রামীণ কর্মসংস্থানের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। এই খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল, যার মধ্যে ৯ লাখ মানুষ সরাসরি এবং ৬ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে যুক্ত আছেন। দেশের অভ্যন্তরীণ বস্ত্র চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ মেটাতে এই শিল্প প্রতি বছর প্রায় ৬৮ কোটি মিটার কাপড় উৎপাদন করে থাকে। এদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিশ্বখ্যাত জামদানি, মসলিন, বেনারসি, টাঙ্গাইল, মনিপুরী, সিল্ক এবং কাতান শাড়ির পাশাপাশি লুঙ্গি, গামছা, থ্রি-পিস, বিছানার চাদর ও তোয়ালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পোশাকও এই তাঁতিরাই তৈরি করেন। আইএমইডির প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আর্থিক ও ভৌত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও যদি সঠিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং সঠিক বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা না যায়, তবে সরকারের শত শত কোটি টাকার প্রকল্প কোনোদিনই এদেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচাতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...