সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০৫ পূর্বাহ্ন

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবনাবসান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি ও আইন অঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। আজ রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে বরেণ্য এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশজুড়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রবীণ এই আইনবিদের প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটেছিল তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই। ১৯৪৫ সালে তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি প্রথম রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন এবং ন্যাপের (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) রাজনীতির সাথেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেন, তখন জমির উদ্দিন সরকার তাতে সক্রিয়ভাবে সাড়া দেন। জিয়াউর রহমান কর্তৃক গঠিত ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ বা সংক্ষেপে ‘জাগদল’-এ তিনি যোগদান করেন এবং দলটির ওয়ার্কিং কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নীতিনির্ধারক তথা স্থায়ী কমিটির অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য মনোনীত হন।

আইন পেশায় অনন্য মেধা, সুনাম ও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর গভীর পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি দ্রুতই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাঁর এই আইনি ও কূটনৈতিক সুখ্যাতির কারণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়কালে পাঁচবার তাঁকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে নিউইয়র্কে পাঠান। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরতে তিনি সে সময় অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে রাষ্ট্র পরিচালনায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেছেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রীসভায় তিনি ৬ এপ্রিল ১৯৮১ থেকে ২৭ নভেম্বর ১৯৮১ সাল পর্যন্ত গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদকালেই তিনি শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত ও ঝুলে থাকা নির্মাণকাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান রাখেন। জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বরণের পর গঠিত রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় তিনি ২৭ নভেম্বর ১৯৮১ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুত্থিত হলে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরে আসেন। পঞ্চম জাতীয় সংসদে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম মন্ত্রীসভায় ২০ মার্চ ১৯৯১ থেকে ২৮ আগস্ট ১৯৯১ পর্যন্ত তিনি ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১ থেকে ১৯ মার্চ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের পূর্ণ শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। একই সাথে তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের স্বল্পকালীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রীসভায় ১৯ মার্চ ১৯৯৬ থেকে ৩০ মার্চ ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সংক্ষিপ্ত দায়িত্ব পালনকালেই তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল’ প্রণয়ন ও তা সংসদে পাস করানোর ক্ষেত্রে এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদের অভিভাবক বা স্পিকারের আসনেও সমাদৃত হয়েছিলেন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২৮ অক্টোবর ২০০১ তারিখে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২৫ জানুয়ারি ২০০৯ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার সাথে এই সর্বোচ্চ পদটি অলঙ্কৃত করেন। স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালেই তাঁর জীবনের অন্যতম এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর, দেশের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণার্থে এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ২১ জুন ২০০২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি সফলভাবে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি দেশের বিভিন্ন আসন থেকে একাধিকবার মহান জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি তৎকালীন দিনাজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন। এরপর ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রাজধানী ঢাকার ঢাকা-৯ আসন থেকে বিএনপির টিকিটে বিজয়ী হন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর নিজ জন্মভূমি অঞ্চলের পঞ্চগড়-১ আসন থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন, ১২ জুন ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচন এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক জয়ের গৌরব অর্জন করেন। সর্বশেষ ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ আসনের মর্যাদাপূর্ণ উপ-নির্বাচনেও তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত বর্তমান পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি নামক একটি প্রত্যন্ত ও সম্ভ্রান্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা ছিলেন মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মাতা বেগম ফখরুন্নেছা। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার প্রবল আগ্রহে ১৯৬১ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান এবং লন্ডনের বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লিংকনস ইন থেকে সফলভাবে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি লাভ করেন। প্রবাস জীবন শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে তিনি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন এবং দেশের সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ হিসেবে দেশব্যাপী বিপুল খ্যাতি ও সুনাম কুড়ান।

পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ছিলেন অত্যন্ত সুখী ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ। তাঁর সহধর্মিণী নূর আখতার। তিনি এক কন্যা নিলুফার জমির এবং দুই পুত্র নওশাদ জমির ও নওফল জমিরের জনক। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি ও জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরও পিতার আদর্শ ধারণ করে বর্তমানে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত রয়েছেন। প্রবীণ এই রাষ্ট্রনায়কের প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।


এ জাতীয় আরো খবর...