শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

মালাক্কা দ্বিধা এড়াতে চীনের করিডর হেজিং কৌশল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য এখনো বহুলাংশে সমুদ্রপথের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানি, খনিজ জ্বালানি ও খাদ্যশস্যের জোগান কিংবা নিত্যব্যবহার্য পণ্য—সব ক্ষেত্রেই সামুদ্রিক পরিবহনই এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে সাশ্রয়ী, বৃহৎ এবং কার্যকর মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃত। সমুদ্রপথের মূল চালিকাশক্তি হলো এর দানবীয় পরিবহনক্ষমতা। একটি বিশাল কনটেইনারবাহী জাহাজ বা তেলবাহী সুপার ট্যাংকার একবারে যে পরিমাণ পণ্য বহন করতে সক্ষম, সেই সমপরিমাণ মালামাল স্থলপথে পরিবহনের জন্য হাজার হাজার মালবাহী ট্রেন কিংবা ট্রাকের প্রয়োজন পড়ে। তা ছাড়া জাহাজ চলাচলের বৈশ্বিক নিয়ম, বিমা এবং সুপরিণত আর্থিক কাঠামোর কারণে সমুদ্রপথের খরচ স্থলপথের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যেভাবে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক সংঘাত বাড়ছে, তাতে এই চেনা সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা নিয়ে বড় বড় অর্থনীতিগুলো নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী দেশ হলো চীন।

বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকেরা খুব ভালো করেই জানেন যে, আগামী কয়েক দশকেও বিশ্ববাণিজ্যের মূল ভিত্তি সমুদ্রপথই থাকবে। কিন্তু কোনো একটি নির্দিষ্ট নৌপথ, প্রণালি বা বন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যে চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বোধ থেকেই চীন এখন ‘করিডর-হেজিং’ নামের একটি নতুন ধারণার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, শেয়ারবাজারের একজন চতুর বিনিয়োগকারী ঝুঁকি কমানোর জন্য যেমন তাঁর সমস্ত পুঁজি একটিমাত্র খাতে বিনিয়োগ না করে একাধিক জায়গায় ছড়িয়ে দেন; বেইজিংও ঠিক তেমনি তাদের জ্বালানি ও বাণিজ্যিক পণ্য আমদানির পথকে একটিমাত্র সামুদ্রিক লাইনের ওপর নির্ভরশীল রাখতে চাইছে না। সমুদ্রপথই তাদের মূল বাণিজ্য রুট হিসেবে বহাল থাকবে, কিন্তু আপদকালীন বা সংকটের সময়ে জরুরি ব্যবহারের জন্য তারা একাধিক বিকল্প স্থলপথ, পাইপলাইন এবং আঞ্চলিক করিডর প্রস্তুত রাখতে চায়, যাতে আকস্মিক কোনো যুদ্ধের সময় সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হয়।

চীনের এই মহাপরিকল্পনার মূল মনস্তাত্ত্বিক তাগিদ এসেছে তাদের দীর্ঘদিনের একটি কৌশলগত উদ্বেগ থেকে, যাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকেরা ‘মালাক্কা দ্বিধা’ বা ‘মালাক্কা দোটানা’ নামে অভিহিত করে থাকেন। ২০০৩ সালে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও প্রথম প্রকাশ্যে এই গভীর আশঙ্কার কথা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন। ভৌগোলিকভাবে মালয় উপদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মধ্যে অবস্থিত ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও অত্যন্ত সংকীর্ণ এই মালাক্কা প্রণালিটি মূলত ভারত মহাসাগরের সাথে দক্ষিণ চীন সাগরকে যুক্ত করেছে। চীনের আমদানিকৃত মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সিংহভাগই হরমুজ প্রণালি পার হয়ে এই মালাক্কা জলপথ দিয়েই মূল ভূখণ্ডে পৌঁছায়। চীনের উদ্বেগ হলো, আন্তর্জাতিক এই জলপথটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের একটি শক্তিশালী ও একচ্ছত্র নৌ-উপস্থিতি রয়েছে। ফলে কোনো বড় ধরণের সামরিক সংঘাত তৈরি হলে শত্রুপক্ষ যদি এই সংকীর্ণ ফানেল আকৃতির প্রণালিটি অবরুদ্ধ করে দেয়, তবে মুহূর্তের মধ্যে চীনের শিল্পোৎপাদন ও অর্থনীতি পুরোপুরি অচল হয়ে পড়তে পারে।

এই ‘মালাক্কা দ্বিধা’ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই চীন গত এক দশক ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে চলেছে। এই কৌশলের সবচেয়ে বাস্তবমুখী ও আলোচিত উদাহরণ হলো চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিএমইসি)। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে সড়ক, আধুনিক রেলপথ এবং তেল-গ্যাসের পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশকে যুক্ত করার এই মেগা প্রকল্পটি মূলত মালাক্কা প্রণালিকে সম্পূর্ণ বাইপাস বা এড়ানোর একটি জাদুকরী কৌশল। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকা থেকে আসা জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো মালাক্কার বিপজ্জনক জলপথে না ঢুকে সরাসরি বঙ্গোপসাগর হয়ে মিয়ানমারের বন্দরে খালাস হতে পারবে এবং সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তা চীনে চলে যাবে। ঠিক একই কৌশলগত মূল্য রয়েছে পাকিস্তান ভিত্তিক চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিসি), যা আরব সাগরের গওয়াদর বন্দরকে সরাসরি পশ্চিম চীনের সাথে সংযুক্ত করেছে।

অবকাঠামোগত ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে মিয়ানমার কিংবা পাকিস্তানের এই স্থল করিডরগুলো কখনোই বিশাল সমুদ্রপথের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হতে পারবে না, কিন্তু বেইজিংয়ের কাছে এগুলোর আসল মূল্য হলো সংকটের সময়ে বিকল্প ও নিরাপদ প্রবেশপথ হিসেবে কাজ করা। এর পাশাপাশি মধ্য এশিয়ার দেশ তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি পশ্চিম চীনে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তার জন্য কোনো সামুদ্রিক জলপথ বা প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না। অতি সম্প্রতি চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে যুক্ত করে একটি নতুন ত্রিপক্ষীয় ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর’ (সিএমবিইসি) গঠনের যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা-ও বেইজিংয়ের এই বহুমুখী বিকল্প পথ তৈরির কৌশলেরই একটি অংশ। এর ফলে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে চীনের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশাধিকার আরও এক ধাপ মজবুত হবে।

বিগত বছরগুলোতে চীনের এই ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পের ব্যাপক বিস্তারের ফলে অনেকের মনে এমন একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, স্থলপথ হয়তো অদূর ভবিষ্যতে সমুদ্রপথের আধিপত্য কেড়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবমুখী নীতিনির্ধারকেরা জানেন যে স্থল করিডর সচল রাখতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, শুল্কনীতি এবং ট্রেনের লাইনের মানের মতো একাধিক দেশের রাজনৈতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়, যা বেশ জটিল। তাই চীনের লক্ষ্য কোনো একক ‘সুপার করিডর’ তৈরি করা নয়, বরং একটি নমনীয় ও আন্তঃসংযুক্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে একটি পথ বন্ধ হলে অন্য পথ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রেশার ভাল্ব হিসেবে কাজ করবে। একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বলা হতো, যে শক্তির নিয়ন্ত্রণে সমুদ্রপথ থাকবে, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর নেতৃত্ব থাকবে তাদেরই হাতে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই তৃতীয় দশকে এসে বিশ্বরাজনীতির সেই চেনা সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন কৌশলগত সুবিধা ও আধিপত্য মূলত নির্ভর করছে কার হাতে সংকটের সময়ে সবচেয়ে বেশি কার্যকর বিকল্প পথ রয়েছে তার ওপর, যা আগামী দিনে বিশ্ববাণিজ্যের নতুন মানদণ্ড হতে চলেছে।

তথ্যসূত্র: সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, মডার্ন ডিপ্লোম্যাসি, প্রথম আলো


এ জাতীয় আরো খবর...