অধিকৃত পশ্চিম তীরের পাহাড়ি চূড়াগুলো থেকে শুরু করে প্রতিটি সংযোগ সড়কের দুই পাশে এখন উড়ছে নীল ও সাদা রঙের ইসরায়েলি পতাকা। এই দৃশ্যগুলো কেবল কোনো সাধারণ প্রতীক নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের পৈত্রিক ভূমিতে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন ও নতুন নতুন সেনা চৌকি গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদের ভূখণ্ড গ্রাস করার এক আগ্রাসী ও দৃশ্যমান বার্তা। পশ্চিম তীরের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত মাসাফের ইয়াত্তা নামক বেশ কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামের গুচ্ছ এবং জর্ডান উপত্যকার রাখাল ও মেষপালকদের জন্য এই নীল-সাদা পতাকা এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়া অবৈধ বসতিগুলো এখন এক অনিবার্য ও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনের চাক্ষুষ এই দৃশ্যগুলো তাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কীভাবে তাদের চিরচেনা মাতৃভূমিতে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার এবং প্রাত্যহিক জীবনের পরিধি দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। যে মুক্ত ভূমিতে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কোনো বাধা ছাড়াই গবাদিপশু চারণের কাজ করে আসছিলেন, সেখানে এখন প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদের চরম আতঙ্ক কাজ করছে।
জর্ডান উপত্যকার শুষ্ক ও ধু ধু পাহাড়ের বুক চিরে থিয়াব দ্রাঘমে এবং তার ভাই আয়মান দ্রাঘমে যখন তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে চারণভূমির খোঁজে দীর্ঘ যাত্রা শেষে নিজেদের বসতিতে ফিরে আসেন, তখন তাদের প্রতি পদক্ষেপে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। পাহাড়ের কোন পথ দিয়ে তারা যাবেন এবং কোথায় তাদের গবাদিপশুদের চারণের জন্য নিয়ে যাবেন, তা এখন তাদের অত্যন্ত নিখুঁত ও সাবধানে বেছে নিতে হয়। কারণ এই অঞ্চলের অনেক উর্বর ও সবুজ চারণভূমি এখন আর ফিলিস্তিনিদের জন্য বিন্দুমাত্র নিরাপদ নয়। প্রতিনিয়ত উগ্র ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনি রাখালদের ওপর সশস্ত্র ও সহিংস হামলার ঘটনা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জীবন রক্ষার্থে অনেক আদিম চারণভূমি তারা চিরতরে পরিহার করতে বাধ্য হয়েছেন। এখন পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে যে, কিছু নির্দিষ্ট চারণভূমিতে পৌঁছাতে হলে ফিলিস্তিনি রাখালদের সাথে কতিপয় মানবাধিকার কর্মী ও ইসরায়েলি শান্তি কর্মীদের সার্বক্ষণিক হেঁটে যেতে হয়। এই শান্তি কর্মীরা রাখালদের পাশে থেকে ইসরায়েলি সৈন্য ও উগ্র বসতিস্থাপনকারীদের সাথে ফিলিস্তিনিদের যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ ও মুখামুখি হওয়ার ঘটনাগুলো নিজেদের ক্যামেরায় নথিবদ্ধ ও প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করেন, যাকে প্রবাসীরা এবং ভুক্তভোগীরা একটি সুরক্ষামূলক উপস্থিতি হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলে মেষপালন ও পশুপালনের চাক্ষুষ পদ্ধতি ও ঐতিহ্যের কোনো পরিবর্তন না হলেও, এই পেশাকে কেন্দ্র করে চারপাশে যে তীব্র জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ও ভয়ংকর। আট সন্তানের জনক থিয়াব অত্যন্ত দুঃখের সাথে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের চরম অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে, তারা মূলত শান্তিপ্রিয়, অতিথিপরায়ণ ও পরোপকারী মানুষ এবং নিজেদের ভূমিতে সবার সাথে শান্তিতে বসবাস করতে চান। কিন্তু চরম বাস্তবতার নির্মম পরিহাস হলো, তার ছোট ছোট সন্তানেরা জীবনের শুরু থেকেই তাদের চোখের সামনে দেখছে ইসরায়েলি বাহিনীর বুট, নির্বিচার ঘরবাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য, বলপূর্বক উচ্ছেদ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের চরম অনিশ্চয়তা। একজন সাধারণ বাবার মনে স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্ন প্রতিনিয়ত জাগে যে, প্রতিনিয়ত বোমার শব্দ আর উচ্ছেদের আতঙ্কের মাঝে বেড়ে ওঠা একটি নিষ্পাপ শিশুর জন্য ভবিষ্যতে আসলে কেমন পৃথিবী অপেক্ষা করছে। জর্ডান উপত্যকা এবং মাসাফের ইয়াত্তার এই প্রান্তিক মেষপালকদের কাছে তাদের এই চিরচেনা জমি কেবল গবাদিপশুর ঘাস খাওয়ার চারণভূমি মাত্র নয়, বরং এটি তাদের বংশানুক্রমিক ঘরবাড়ি, একমাত্র জাতিগত পরিচয় এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অর্থনৈতিক উৎস। কিন্তু চারপাশের পাহাড়ের চূড়ায় যেভাবে প্রতিদিন নতুন নতুন ইসরায়েলি ফাঁড়ি ও অবৈধ বসতি স্থাপন করা হচ্ছে, তাতে ফিলিস্তিনিদের চারণের জন্য অবশিষ্ট মুক্ত জায়গাটুকু খুব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
দ্রাঘমে ভাইদের মতো শত শত ফিলিস্তিনি পরিবার আজ নিজেদের নিজ ভূমিতেই এক চরম অবরুদ্ধ ও অবদমিত ভূখণ্ডের মধ্যে জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত মৌলিক পশুপালনের মতো সাধারণ একটি পেশাও এখন চরম বিপদ ও মৃত্যুর ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফিলিস্তিনি রাখালদের জীবনের এই ভঙ্গুর ও করুণ পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে তাদের পাশে থাকা মানবাধিকার কর্মীদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি। কারণ এই সুরক্ষামূলক ও সহমর্মী মানুষেরা সাথে না থাকলে রাখালদের জন্য অধিকাংশ উর্বর পাহাড়ি উপত্যকা ও পানির উৎসগুলো সম্পূর্ণ অলঙ্ঘনীয় ও নাগালের বাইরে থেকে যায়, কারণ একা গেলে উগ্রপন্থীদের সশস্ত্র হামলার শিকার হওয়া বা সেনাদের হাতে আটক হওয়ার তীব্র শঙ্কা থাকে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল একটি অঞ্চলের রাখালদের জীবিকার সমস্যা নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের আন্তর্জাতিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত ভূরাজনৈতিক কৌশল। এই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ, রাষ্ট্রীয় বৈষম্য এবং জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি রাখালরা তাদের পৈত্রিক পেশা ও ঐতিহ্য থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি। তারা এখনো প্রতিদিন ভোরবেলা তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে পাহাড় থেকে পাহাড়ে ঘাস ও সুপেয় পানির সন্ধানে ঘুরে বেড়ান এবং এই কঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে তারা মূলত তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া হাজার বছরের পুরনো জীবনযাত্রাকে টিকিয়ে রাখার এক নীরব ও অহিংস প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন। থিয়াব ও তার সুদীর্ঘ পরিবারের জন্য পাহাড়ের চূড়ায় উড়তে থাকা ওই দূরবর্তী নীল-সাদা পতাকাগুলো আসলে একটি চরম অন্ধকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিয়মিত ও নির্মম সতর্কবার্তা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ