শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৩ পূর্বাহ্ন

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কায় পাকিস্তান

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে চলমান তীব্র উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এবার সম্পূর্ণ নতুন ও জটিল এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আপেক্ষিক যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটিয়ে সৌদি আরবের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আবারও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন হুথি। এই আকস্মিক হামলার পর ইরান ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যেমন বড় ধরণের চির ধরেছে, ঠিক তেমনি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তানও এই নতুন আঞ্চলিক সংঘাতের গভীরে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে তীব্র আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হুথি ও সৌদির মধ্যকার এই নতুন যুদ্ধ ইসলামাবাদকে একটি বড় ধরণের আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা বিশ্বমঞ্চে তাদের এতদিনের মধ্যস্থতাকারীর নিরপেক্ষ ভূমিকাকে চরম সংকটের মুখে ফেলবে। এছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অতীতের এক বিশেষ প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণেও ইসলামাবাদকে এখন অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ইয়েমেনের এই শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের দাবি, সৌদি আরবের রাজকীয় বাহিনী হুথি-নিয়ন্ত্রিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে আকস্মিক বিমান হামলা চালানোর কারণেই তারা এর মোক্ষম জবাব হিসেবে গত সোমবার রিয়াদের দিকে এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এই ঘটনার ফলে দীর্ঘদিনের শান্তি আলোচনা ও সীমান্ত যুদ্ধবিরতি ভেঙে দুই দেশের সীমান্তে নতুন করে যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ। মূলত গত বছর সৌদি আরবের সঙ্গে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল পাকিস্তান। সেই ঐতিহাসিক চুক্তির শর্তানুযায়ী, সৌদি আরবের সীমান্ত পাহারা ও প্রতিরক্ষায় বর্তমানে হাজার হাজার পাকিস্তানি সেনা সদস্য এবং দেশটির বিমানবাহিনীর একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন সৌদির মাটিতে সার্বক্ষণিক মোতায়েন রয়েছে। এই পরিস্থিতির মাঝেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের এক অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন যে, পাকিস্তানের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক যৌথ নেতৃত্ব ইতিমধ্যে ইরান সরকারকে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক চ্যানেলে কড়া বার্তা দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো ধরণের হামলাকে পাকিস্তান সরাসরি নিজের ওপর হামলা বলে গণ্য করবে এবং এটিই ইসলামাবাদের জন্য চূড়ান্ত রেড লাইন।

তবে ইয়েমেন ও সৌদির মধ্যকার এই যুদ্ধাবস্থা যে এত দ্রুত ও আকস্মিকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, তা ইসলামাবাদের নীতিনির্ধারকেরা আগে থেকে মোটেও প্রত্যাশা করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রখ্যাত নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা। দেশটির অভ্যন্তরীণ সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেন সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি কৌশলগত এলাকাগুলোতে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর একটি বড় অংশ মোতায়েন থাকায়, হুথিদের এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা যদি অব্যাহত থাকে তবে পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা পাকিস্তানের জন্য এক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে কারণ দেশটির সিংহভাগ জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য এই সামুদ্রিক নৌপথটিই একমাত্র লাইফলাইন। পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল গুলাম মুস্তাফা এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, আপাতত পাকিস্তান সব পক্ষকে শান্ত রাখতে এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, তবে হুথিরা যদি সৌদির আরও গভীরে বা গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলা সম্প্রসারণ করে, তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং পাকিস্তান সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হবে।

এই সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার মারাত্মক বিভাজন ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও ইসলামাবাদকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। পাকিস্তানের দুজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার তথ্য মতে, ইরানের বর্তমান বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং দেশটির প্রধান সামরিক শক্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মধ্যকার গভীর মতপার্থক্য খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে বেইজিং ও ইসলামাবাদ। তাদের দাবি, ইরানের বর্তমান সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের কূটনৈতিক ও নরম অবস্থানের সঙ্গে আইআরজিসির কট্টরপন্থী যুদ্ধংদেহী অবস্থানের পার্থক্য দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আলী এই অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে বলেন, ইরানে যেকোনো ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশটির সামরিক ও রেভল্যুশনারি গার্ডের প্রভাব ক্রমেই স্বৈরতান্ত্রিকভাবে বাড়ছে এবং ইসলামাবাদ এই বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে বলেই তারা তাদের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে সতর্ক হচ্ছে।

এই আকস্মিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান গোপন সমঝোতা ও পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের ইরানি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর করার কথা থাকলেও, এই যুদ্ধের কারণে তাদের নির্ধারিত সূচি কয়েকদিন পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে নির্ধারিত সময়ের দুই দিন পর গত বুধবার প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের রাজধানীতে এসে পৌঁছায়। এই বৈরী পরিস্থিতির মধ্যেও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ইসলামাবাদ মধ্যপ্রাচ্যের সব পক্ষকে তাদের নিজেদের স্বার্থে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের জোর আহ্বান জানাচ্ছে। তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক সংকটে টেকসই সম্পৃক্ততা, দ্বিপক্ষীয় সংলাপ ও কার্যকর কূটনীতির কোনো বিকল্প হতে পারে না।

বর্তমানে পাকিস্তান একদিকে যেমন সৌদি আরবের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদার, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ইরানের সঙ্গেও তারা তাদের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না, যার ফলে তারা এক চরম কঠিন ভারসাম্যের মুখোমুখি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইরানি যুদ্ধজাহাজের উত্তেজনার কারণে ইতিমধ্যে পাকিস্তানের জাতীয় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট সামাল দিতে ও ডলার বাঁচাতে দেশটির সরকার ইতিমধ্যে রাতের বেলা সমস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শপিংমল আগেভাগে বন্ধ রাখাসহ একাধিক জরুরি ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার পেছনে কেবল তাদের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সস্তা লক্ষ্য নয়, বরং নিজেদের জ্বালানি সরবরাহের পথ স্বাভাবিক রাখাই তাদের মূল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য। এ বিষয়ে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, তেহরানের আচমকা আচরণে আমাদের মধ্যে চরম হতাশা রয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা মধ্যস্থতার উদ্যোগ থেকে পিছু হটব। তবে রয়টার্সের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের অবসান সবার কাম্য হলেও রিয়াদ যদি সরাসরি সামরিক সহায়তা চায়, তবে পাকিস্তান তাদের পাশে অস্ত্র হাতে দাঁড়াবেই।

 

তথ্যসূত্র: রয়টার্স


এ জাতীয় আরো খবর...