শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:৫৪ পূর্বাহ্ন

দেড় হাজার কোটি টাকা ঢাললেও ভাঙছে যমুনা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া অঞ্চলে প্রবহমান প্রমত্তা যমুনা নদী বছরের পর বছর ধরে তার ভয়াল ও করালগ্রাসী রূপ প্রদর্শন করে চলেছে। বিশেষ করে প্রতি বছর বর্ষাকাল এলেই এই নদীর অববাহিকায় শুরু হয় প্রলয়ংকরী ও ধ্বংসাত্মক ভাঙন। যমুনার এই আগ্রাসী ভাঙন প্রতিরোধে বিগত ২০ বছর ধরে সরকারি ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নানামুখী বিশাল সব আয়োজন ও স্থায়ী-অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ চলে আসছে। সরকারি নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই দশকে এই ভাঙন ঠেকানোর নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা পানির মতো ব্যয় করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের চূড়ান্ত ফলাফল পুরোপুরি শূন্য। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অভিযোগ, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা করে খরচ করা হলেও সেই বরাদ্দের একটি বিশাল অংশ চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পকেটে চলে গেছে। ফলে কাজের কাজ কিছুই হয়নি এবং সরকারের হাজারো কোটি টাকা যেন যমুনার রাক্ষুসে জলেই সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। এই চরম ব্যর্থতার গ্লানি কাঁধে নিয়েই এখন আবার নতুন করে আরও একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

বিগত দেড় যুগে যমুনার এই সর্বনাশা থাবায় বগুড়ার নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষের বসতভিটা, সাজানো সংসার ও সোনালী ফসলি জমি চিরতরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে নিঃস্ব ও সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে হাজারো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার। বগুড়া অঞ্চলের সীমানায় যমুনা নদী প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে প্রবাহিত হলেও, এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৯ কিলোমিটার এলাকার ডান তীর প্রতিরক্ষার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ২৬ কিলোমিটার নদীতীর এখনও সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে, যার কারণে ওই সমস্ত অঞ্চলে প্রতি নিয়ত ভাঙন অব্যাহত আছে। শুধু নদীর ডান তীরই নয়, বরং বর্ষার তীব্র স্রোতে নদীর দুই পাড়ই এখন সমানতালে ভেঙে চলেছে। যমুনার এই চিরস্থায়ী ভাঙন রুখতে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এ পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে ছয়টি শক্তিশালী স্পার, একটি গ্রোয়েন বাঁধ এবং দুটি বড় হার্ডপয়েন্ট নির্মাণ করেছে। এর পাশাপাশি নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আরও ছয়টি ক্রসবার ও একটি বিশেষ ফিসপাসও তৈরি করা হয়েছে। তবে নদীপাড়ের মানুষের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষায় এগুলো খুব একটা কাজে আসেনি। এ অবস্থায় বগুড়া পাউবোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে আরও প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীতীর সুরক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ‘বগুড়া জেলার যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন’ শীর্ষক একটি নতুন ও যুগোপযোগী প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদন পেলে যমুনার ডান তীরের ভাঙন ধীরগতিতে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার ভৌগোলিক তথ্য ও বিবরণী অনুযায়ী, তিব্বতের পবিত্র মানসসরোবর ও কৈলাস পর্বতের মধ্যবর্তী পার্খা নামক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র রয়েছে। সেই কেন্দ্র থেকে মাত্র ১৪৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চেমায়ুং-দুং নামক এক সুবিশাল হিমবাহ থেকেই মূলত এই ঐতিহাসিক ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি হয়েছে। সুবিশাল ও উর্বর বঙ্গীয় সমভূমিতে পতিত হওয়ার আগে ভারতের আসাম রাজ্যে এই ব্রহ্মপুত্র নদটি স্থানীয়ভাবে ‘ডিহাং’ নামে অভিহিত ছিল। এরপর ভারতের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে এই নদটি প্রথম এদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। গঙ্গাসঙ্গম বা পদ্মার সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সাংপো-ব্রহ্মপুত্র-যমুনার সম্মিলিত জলপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ২৭৬ কিলোমিটার, যার মধ্যে এককভাবে যমুনা নদীর দৈর্ঘ্য ২০৫ কিলোমিটার।

তিব্বত থেকে নেমে আসা এই বিশাল যমুনা নদী বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অবশেষে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের কাছাকাছি এসে পদ্মা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট—এই তিনটি জনবহুল উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদী বগুড়া অংশে মোট ৪৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। বিগত ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২০ বছরে এই অববাহিকায় প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করে যে সমস্ত কাজ করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নের হাসনাপাড়া বাজারের ঠিক সামনে তৈরি করা ৫৫৮ মিটার দীর্ঘ একটি স্পার, যা ২০০২ সালে নির্মিত হয়েছিল। একই বছর ওই একই ইউনিয়নের নিজবলাইল বাজারের সামনেও একই নকশার আরও একটি প্রতিরক্ষামূলক স্পার স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া ধুনট উপজেলার সীমানা থেকে শুরু করে হাসনাপাড়া বাজার পর্যন্ত ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক ধরে যমুনার ডান তীর সংরক্ষণের ব্লক ও বাঁধের কাজ করা হয়। এর আগে ২০০six সালে কালীতলা গ্রোয়েন বাঁধ থেকে পারতিত পরল পর্যন্ত ২ হাজার মিটার এবং দেবডাঙা পয়েন্টে ১ হাজার ২০০ মিটার তীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে রৌহাদহ থেকে মথুরাপাড়া পর্যন্ত আরও ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ তীর সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করে পাউবো।

পাউবো বগুড়ার বর্তমান উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ন কবির এই সংকটের গভীরতা স্বীকার করে জানান যে, জেলার ২৬ কিলোমিটার নদীতীর এখনও কোনো ধরণের স্থায়ী বাঁধ বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যার ফলে বর্ষা ও বন্যা এলেই এই বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বর্তমান সময়ে ভাঙনকবলিত এই অরক্ষিত এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সোনাতলা উপজেলার পাকুল্ল্যা গ্রাম, সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ইউনিয়ন এবং ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ী ও ভান্ডারবাড়ী এলাকা। বর্তমানে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিরিক্ত মৌসুমী বৃষ্টির প্রভাবে যমুনার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যার ফলে প্রতিদিন এই সমস্ত এলাকার শত শত মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি চোখের পলকে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই স্থায়ী মানবিক বিপর্যয় ও ভাঙন রোধে অবিলম্বে সাড়ে ৯ কিলোমিটার নদীতীর প্রতিরক্ষার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো নতুন পুনর্বাসন প্রকল্পটি দ্রুত পাশ হওয়া জরুরি। প্রকল্পটি পাশ হলে আধুনিক প্রযুক্তির জিওব্যাগ ও সিসি ব্লকের মাধ্যমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশে প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...