মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৩ অপরাহ্ন

ডেঙ্গুর লক্ষণ পাল্টে যাওয়ায় বাড়ছে মৃত্যু, বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
ডেঙ্গু

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির আশঙ্কাজনক অবনতির সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এই ভাইরাসের রূপ বা ধরন পরিবর্তনের নতুন আতঙ্ক। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের শারীরিক অবস্থা ও মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন যে, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর পরিচিত লক্ষণগুলোতে স্পষ্ট পরিবর্তন এসেছে। আগে ডেঙ্গু হলে রোগীর শরীরে র‌্যাশ ওঠা কিংবা হাড়ে তীব্র ব্যথার মতো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ একেবারেই অনুপস্থিত থাকছে। লক্ষণ না থাকায় আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা স্বজনেরা ডেঙ্গুর বিষয়টি সময়মতো টের পাচ্ছেন না। ফলে শেষ মুহূর্তে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে এনেও রোগীদের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে হেমোরেজিক ডেঙ্গু এবং রক্তে প্লাটিলেট দ্রুত কমে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তপাতের কারণে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। রোগী সামলাতে হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, অনেক বেসরকারি হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির মতো শয্যা খালি নেই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি হিসেবে গত মাসে ও চলতি মাসের প্রতিদিনের আক্রান্তের সংখ্যা বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার পাশাপাশি ঢাকার বাইরের জেলাগুলো যেমন চট্টগ্রাম ও খুলনায় প্রতিনিয়ত নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১৮ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আসন্ন আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ভরা বর্ষার সময়ে ডেঙ্গুর এই প্রকোপ আরও বেশি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। এ পর্যন্ত সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা আটজন বলা হলেও, বিভিন্ন হাসপাতাল ও বেসরকারি সূত্রে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যেই তিন গুণ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানা যাচ্ছে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের রূপ পরিবর্তন এবং এর জটিলতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা। চার ধরনের বৈচিত্র্যময় সেরোটাইপ বা প্রজাতির মধ্যে কোনটি বর্তমানে বেশি ছড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়ে নতুন করে গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন ভাইরোলজিস্ট ও চিকিৎসকেরা। বিশেষজ্ঞরা জানান, হাসপাতালে আসা ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে এবার মানুষের শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন— কিডনি, লিভার, ফুসফুস ও হার্ট অকার্যকর হয়ে পড়ার হার অনেক বেশি। এডিস মশার মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করা জীবাণু লিভার ও কিডনির কোষে আক্রমণ চালিয়ে প্রদাহের সৃষ্টি করছে এবং অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এমনকি হার্টের পেশি ও মস্তিষ্কে তীব্র প্রদাহের সৃষ্টি হয়ে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম দেখা দিচ্ছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, পূর্বে যারা অন্তত একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তারা দ্বিতীয়বার ভিন্ন কোনো টাইপের মাধ্যমে সংক্রমিত হলে এই সেকেন্ডারি ইনফেকশন অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে দাঁড়ায়। পরিবর্তিত এই ডেঙ্গুতে শরীরের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম (১০১ থেকে ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) থাকে এবং শরীরে তেমন জোরালো ব্যথা অনুভব হয় না, যাকে ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ বলা হয়। সচেতনতার অভাবে এই পরিবর্তনগুলো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেন না। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত এডিস মশার প্রজননকে ত্বরান্বিত করায় আগামী দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিচ্ছেন স্বাস্থ্য গবেষকেরা। তাই যেকোনো প্রকার জ্বর অনুভূত হলে কোনো রূপ অবহেলা না করে দ্রুততম সময়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করানোর জন্য সাধারণ মানুষকে জোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

তবে হাসপাতালে রোগী ভর্তির এই রেকর্ড ভাঙা পরিস্থিতি এবং মৃত্যুর মিছিল সত্ত্বেও সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্যে বাস্তবতার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে এবং এমনকি ডেঙ্গু রোগীর সঠিক সংখ্যা তুলে ধরাকে গুজবের সঙ্গে তুলনা করার অভিযোগও উঠেছে। এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মশা নিধনের মূল দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর ছেড়ে দিয়ে বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষের মতে, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য না দিয়ে অনতিবিলম্বে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আপৎকালীন প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এবং ভাইরাসের ধরন নিয়ে সঠিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালানো না হলে চলমান এই ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


এ জাতীয় আরো খবর...