ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল অঙ্কের অর্থ ফেরত না দিয়েও একের পর এক নজিরবিহীন নীতি-সহায়তার সুবাদে নিজেদের খেলাপি পরিচয় আড়াল করে রাখার সুযোগ পাচ্ছেন দেশের বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। প্রকৃত অর্থ উদ্ধার না করে কেবল কাগজে-কলমে খাতা কলমে ঋণ নিয়মিত দেখানোর এই অকার্যকর কৌশলই এখন পুরো ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় ফাঁদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বছরের পর বছর নানা বাহানায় ছাড় দেওয়া হলেও বারবার সুবিধা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুদিন পরপরই পুনর্নবীকরণকৃত ঋণ অনাদায়ী করে পুনরায় খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের লাগাতার শিথিল নীতির কারণে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমার বদলে জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানে প্রকাশ পেয়েছে যে, মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ এখন বিশ্বমঞ্চে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের দেশের বিষাদময় খেতাব অর্জন করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিপত্র ও বিভিন্ন আর্থিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, বৈশ্বিক মহামারী কিংবা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের অযুহাত দেখিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকই বারবার খেলাপিদের জন্য আইনি ও প্রশাসনিক ফাঁকফোকর তৈরি করে দিয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার বকেয়া পাওনা নিয়মিত করার আবেদন নিয়ে প্রায় ১ হাজার ২০০টিরও বেশি কর্পোরেট আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, নাসা, থার্মেক্স, নাবিল, মাগুরা ও ওরিয়নসহ বেশ কয়েকটি শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্বিন্যাসের আর্জি অন্যতম। রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে পূর্বে নেওয়া ছাড়ের শর্ত ভেঙে এসব প্রতিষ্ঠান বারবার ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছে এবং কিস্তি পরিশোধ না করেও ব্যাংকিং সুবিধা উপভোগ করে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মানদণ্ড অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যার ফলে ২২টি ব্যাংক চরম মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে এবং লোকসানে ডুবেছে ৩৫টি বাণিজ্যিক ব্যাংক।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, বারবার নীতি সহজীকরণ ও সুদ মওকুফের ব্যবস্থা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য এক ধরনের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ব্যাংকের অর্থে বিলাসী জীবনযাপন এবং বিদেশে মূলধন পাচার করেও এসব প্রভাবশালীরা আইনের চোখকে আড়াল করতে পারছেন। নিয়মিত আসল ও সুদ পরিশোধ করা সৎ ও ভালো ব্যবসায়ীরা এ ধরনের গণছাড়ের কারণে চরমভাবে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ব্যাংক এশিয়ার সাবেক শীর্ষ নির্বাহীদের অভিমত অনুযায়ী, ব্যবসায়িক মুনাফার চেয়ে ঋণ পুনঃতপশিল করে মেয়াদ বাড়ানো ও সুদ মওকুফ সুবিধা নেওয়া অনেক বেশি লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ ব্যাংক ঋণে কেনা সম্পদের দাম বাড়লেও খেলাপিদের দায়ের বোঝা বিভিন্ন সরকারি সার্কুলারের মাধ্যমে কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে মূল ঋণ পরিশোধ না করে তারা যুগের পর যুগ ব্যাংকের অর্থ আটকে রাখার সাহস পাচ্ছে।
সংকট মেটাতে অতীতে ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০১৯ সালে ‘এককালীন এক্সিট’ ও ‘বিশেষ পুনঃতপশিল’ নাম দিয়ে কিস্তির সময়সীমা বাড়ানোসহ সুদহার কমানোর যেসব সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তার সুফল ব্যাংক খাত পায়নি। উল্টো ওইসব সুবিধা গ্রহণকারী প্রায় প্রতিটি বড় কোম্পানি পরবর্তীতে পুনরায় খেলাপির খাতায় নাম লিখিয়েছে। বর্তমান সময়েও অন্তর্বর্তী সরকার ও পরবর্তী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে দুই বছরের ছাড় বা গ্রেস পিরিয়ডসহ নানা ধরনের মওকুফ সুবিধা দেওয়ায় নতুন করে ঋণ আদায়ের পথ রুদ্ধ হয়েছে। ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন যে, আমানতকারীদের জমানো অর্থ দিয়ে ব্যবসা চালুর পর পাওনা আদায় করতে না পারলে ব্যাংকগুলোকে উল্টো কর ও লভ্যাংশ মেটাতে হয়, যা ব্যাংকগুলোর অস্তিত্বকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালায় কঠোর সংস্কার এনে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সামাজিক ও আইনিভাবে বয়কট না করা হলে এই সর্বগ্রাসী ঋণ সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
তথ্যসূত্র: সমকাল