বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৪ পূর্বাহ্ন

জ্বালানি সংকটে বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ থমকে গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

দেশের শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান ক্ষেত্র বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আশঙ্কাজনক হারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যাংকিং খাতে সুদের হার কমানো কিংবা বিভিন্ন প্রণোদনা দিয়েও উদ্যোক্তাদের ঋণের প্রতি আগ্রহী করা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ী ও ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মতে, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চয়তা না দিয়ে কেবল আর্থিক নীতি সহজ করে এই স্থবিরতা দূর করা সম্ভব নয়। বিগত চার বছর আগে যেখানে বেসরকারি ঋণ প্রবাহের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৪ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, তা ধারাবাহিকভাবে কমতে কমতে বর্তমানে ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। মূলধনের অভাবের চেয়েও নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান কারখানাগুলো সচল রাখতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়াই এখন দেশের অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বড় বৈরী অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেট্রোবাংলা এবং শিল্প মালিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে দৈনন্দিন গ্যাসের ঘাটতি এখন কোনো সাময়িক বিপর্যয় নয়, বরং এটি জাতীয় উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার ওপর এক স্থায়ী হুমকিতে রূপ নিয়েছে। দেশে দৈনিক অন্তত ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উত্তোলন ও আমদানীকৃত এলএনজি মিলিয়ে কোনো মতে ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন ১ হাজার ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি বা মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি গ্যাসের বিশাল ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে সার কারখানা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বাড়তি গ্যাস সরানোর কারণে কলকারখানায় গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ বা প্রেশার নামমাত্র পর্যায়ে নেমে আসে। এতে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, গ্লাস, সিরামিক, ইস্পাত, সিমেন্ট এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতের প্রায় ৪০০টির মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন চালাতে পারছে।

জ্বালানি সংকটে বিনিয়োগ ভেস্তে যাওয়ার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ‘সিটি গ্রুপ’। মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ছয়টি বৃহৎ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ২০২০ সালের পর সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলেও আজ পর্যন্ত সেখানে গ্যাস সংযোগ মেলেনি। কারখানা চালুর মুখ না দেখায় গ্রুপটির প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণ এখন খেলাপি হওয়ার ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে, যা থেকে রক্ষায় তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। দেশে বর্তমানে দৈনিক উৎপাদিত বিদ্যুৎ সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে বাস্তবে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল জমে যাওয়া এবং গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ার প্রভাব সরাসরি এসে পড়ছে ব্যাংকের আমমানত ও খেলাপির খাতায়, যা ব্যাংক খাতকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ২০২০ সালে মহামারীর পূর্বেও বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের উপরে ছিল। পরবর্তীতে হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা সত্ত্বেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশে নামে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অলিগার্কদের ব্যাংক দখলের ঘটনা প্রকাশের পর গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ব্যাংক নির্বাহীদের মতে, বিগত বছরগুলোতে দৃশ্যমান ঋণ প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই ছিল প্রকৃতপক্ষে অন আদায়কৃত সুদের হিসাব এবং ভুয়া বেনামী প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা পাচারকৃত অর্থ। বাস্তবে নতুন কারখানা স্থাপন বা প্রবৃদ্ধি সহায়তায় ব্যাংক থেকে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল হাতেগোনা।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী চেম্বারগুলোর প্রতিনিধিরা জ্বালানি খাতকে নীতিনির্ধারণের মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন। শুধুমাত্র সুদের হার কমিয়ে বা ব্যাংকিং খাতে নমনীয়তা এনে বিনিয়োগ টানা যাবে না, কারণ গ্যাস ছাড়া কারখানা কেবল দেশের জন্য আর্থিক বোঝা তৈরি করবে। এমসিসিআই ও বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধানদের মতে, রফতানিমুখী শিল্পের বিশ্ববাজার টিকিয়ে রাখতে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা জরুরি। এছাড়া জ্বালানির ওপর কর ও শুল্কের হার পুনর্নির্ধারণ করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সরকার কর্তৃক সম্প্রতি ঘোষিত বিশাল প্রণোদনা তহবিলও বেসরকারি খাতে ঋণ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...