শিরোনামঃ
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন

ইউরোপের ‘রিটার্ন হাব’ পরিকল্পনা: প্রত্যাখ্যাত বাংলাদেশীদের পাঠানো হতে পারে আফ্রিকায়

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের এক অভিনব ও কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ইউরোপের পাঁচটি প্রভাবশালী দেশ। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস এবং গ্রিস যৌথভাবে এই নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। এই পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো, যেসব অভিবাসনপ্রত্যাশীর আশ্রয়ের আবেদন চূড়ান্তভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে, তাদের সাময়িকভাবে ইউরোপের বাইরের কোনো দেশে স্থানান্তর করা। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশী নাগরিকও রয়েছেন, যাদের আশ্রয়ের আবেদন ইউরোপে প্রায়শই নাকচ হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত এই দেশগুলোর সঙ্গে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও, সম্ভাব্য আশ্রয়দাতা দেশ হিসেবে আফ্রিকার কেনিয়া, উগান্ডা, ঘানা, রুয়ান্ডা, বেনিন, মৌরিতানিয়া এবং এশিয়ার উজবেকিস্তানের সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা চলমান রয়েছে। ইউরোপের দীর্ঘদিনের অভিবাসন নীতিতে এটি একটি যুগান্তকারী ও বিতর্কিত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।

এই পাঁচটি দেশের মধ্যে গ্রিস ‘রিটার্ন হাব’ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়তা প্রদর্শন করছে। দেশটির অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানানো হয়েছে যে, তারা চলতি বছরের মধ্যেই তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। সবকিছু তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী বছর থেকেই এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুরোদমে কার্যকর করা হতে পারে। মূলত ইউরোপীয় কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’ বা আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই এই উদ্যোগটি ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। এই নতুন নিয়মে নির্দিষ্ট কিছু আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে তাদের সীমানার বাইরে এ ধরনের কেন্দ্র স্থাপনের বৈধতা দেয়া হয়েছে। আর ঠিক এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে ওই পাঁচটি দেশ সম্ভাব্য আয়োজক দেশগুলোর সঙ্গে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

পরিকল্পনাটির পেছনের মূল কারণ হিসেবে বর্তমান প্রত্যাবাসন ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে তুলে ধরা হচ্ছে। ইউরোপের দেশগুলোর যুক্তি হচ্ছে, বর্তমানে যাদের ইউরোপ থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় বহিষ্কার বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়, তাদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম মানুষকে বাস্তবে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থী অবৈধভাবে ইউরোপেই থেকে যান, যা সেখানকার আশ্রয় ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। প্রস্তাবিত নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, নতুন আশ্রয়ের আবেদনগুলো সর্বোচ্চ বারো সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জোর চেষ্টা করা হবে। এই সময়ের মধ্যে যেসব আবেদন অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে, তাদের দ্রুততার সঙ্গে নিজ দেশে কিংবা তৃতীয় দেশের ওই ‘রিটার্ন হাবে’ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইউরোপের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর, দ্রুত ও গতিশীল হবে।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে এখন পর্যন্ত এই রিটার্ন হাব নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য বা প্রস্তাব পাঠানো হয়নি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর প্রধান কারণ হলো, পুরো বিষয়টি এখনো ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আলোচনা ও নীতিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর নিজেদের মধ্যেও এই প্রস্তাবটি নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য বিরাজমান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগটি এককভাবে কেবল বাংলাদেশের জন্য নেয়া হয়নি। বরং ইউরোপে যেসব দেশের নাগরিকদের আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হবে, তাদের সবার ক্ষেত্রেই এটি সমানভাবে প্রয়োগ করা হবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ইউরোপে বাংলাদেশীদের আশ্রয়ের আবেদন করার হার অনেক বেশি হলেও, তা গৃহীত হওয়ার হার একেবারেই নগণ্য। বর্তমানে প্রথম ধাপে বাংলাদেশীদের আবেদনের মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ স্বীকৃতি পেয়ে থাকে। নতুন নীতি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশীদের নতুন আশ্রয় আবেদনগুলো আগের তুলনায় দ্রুত নিষ্পত্তির আওতায় আসবে এবং প্রত্যাখ্যাতদের দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ইউরোপে বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীদের একটি বিশদ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে আশ্রয় আবেদনকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। সিরিয়া, ভেনিজুয়েলা এবং আফগানিস্তানের পরই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশী নাগরিকদের মোট ছত্রিশ হাজার নয়শত এক টি আশ্রয়ের আবেদন জমা পড়েছিল, যার মধ্যে পঁয়ত্রিশ হাজার দুইশত পঁয়তাল্লিশ টি ছিল প্রথমবারের মতো করা আবেদন। একই সময়ের মধ্যে তেতাল্লিশ হাজার পাঁচশত তেইশ টি আবেদনের ওপর প্রথম ধাপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং এক হাজার একশত সত্তর টি আবেদন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তবে বছরের শেষভাগে এসেও একচল্লিশ হাজার ছয়শত বিরানব্বই টি আবেদন বিভিন্ন সদস্যদেশে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলছিল। সবচেয়ে হতাশাজনক পরিসংখ্যান হলো, বাংলাদেশীদের এসব আবেদনের প্রথম ধাপের স্বীকৃতির হার ছিল মাত্র তিন শতাংশ।

ইইউএএ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বিষয়ক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অনেক বাংলাদেশী নাগরিক তাদের আশ্রয়ের আবেদনে দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোকে উল্লেখ করেছেন। যদিও ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশীদের আশ্রয়ের আবেদন প্রায় পনেরো শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তার পরও ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম প্রধান একটি উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখনো উপরের দিকেই রয়ে গেছে। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যও বিষয়টি জোরালোভাবে সমর্থন করে। তাদের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরের অত্যন্ত বিপজ্জনক রুট ব্যবহার করে অবৈধ ও অনিয়মিতভাবে ইউরোপে প্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশীদের সংখ্যা রীতিমতো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে।

এই সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক জানিয়েছেন যে, ইউরোপের এই পাঁচ দেশের রিটার্ন হাব উদ্যোগ সম্পর্কে সরকারিভাবে এখনো তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিদেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করার মতো কোনো যৌক্তিক পরিস্থিতি বা কারণ দেশে বিদ্যমান নেই। দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত হয়েছে এবং সকল নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা এখন পুরোপুরি সুরক্ষিত রয়েছে। তাই রাজনৈতিক আশ্রয়ের নামে এই ধরনের অভিবাসনকে তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, সরকার সবসময়ই অবৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসনকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে আসছে এবং নাগরিকদের বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। অনেকেই অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশ করে পরবর্তীতে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। সংশ্লিষ্টরাও মনে করেন, রাজনৈতিক আশ্রয়কে কেবল অভিবাসনের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যই নেতিবাচক পরিণতি বয়ে আনে।

ইউরোপের এই পরিকল্পনাটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী ও সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের মানবাধিকার কমিশনার এরই মধ্যে ওই পাঁচটি দেশের সরকারকে একটি কড়া চিঠি দিয়ে আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং নন-রিফাউলমেন্ট নীতি অত্যন্ত কঠোরভাবে মেনে চলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ইউরোপের বাইরে এ ধরনের প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হলে আশ্রয়প্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা, কার্যকর বিচারিক প্রতিকার পাওয়ার অধিকার এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, প্রত্যাবাসন সহজ করার উদ্দেশ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় কোনো দেশে নির্বাসনে পাঠানোর এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হওয়ার বিশাল ঝুঁকি তৈরি করে।

অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী তার বক্তব্যের সপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং ব্যবস্থার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, ওই ধরনের নীতির কারণে আশ্রয়প্রার্থীদের বছরের পর বছর ধরে চরম অনিশ্চয়তা ও মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে জীবন কাটাতে হয়। সেখানে তাদের কার্যকর আইনি সহায়তা, জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং বিচারিক প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ে। তাই ইউরোপ যদি সত্যিই এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা চালু করতে চায়, তবে সবার আগে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ইউরোপীয় কমিশনের নতুন রিটার্ন নীতি প্রস্তাব এবং পাঁচ দেশের এই রিটার্ন হাব উদ্যোগটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ এগুলোর যেকোনো একটি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশী আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন নিষ্পত্তি, প্রত্যাবাসন এবং সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...