রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় নেতা এবং সহযোগী সংগঠনের সাবেক নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ মর্যাদার পদগুলোতে বিএনপির ১২ জন রাজনৈতিক নেতাকে এক বছরের জন্য পদায়ন করায় আমলাতন্ত্রের ভেতরে চরম অস্বস্তি ও হতাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বাভাবিক পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা ক্যারিয়ার কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার জায়গায় এভাবে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি জারি করা একগুচ্ছ পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়সহ সরকারি বিভিন্ন করপোরেশন ও ট্রাস্টে এই নিয়োগগুলো ঘোষণা করা হয়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রত্যেকেই বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি, যুবদল বা শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বা করছেন। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকে এক বছরের জন্য এই নিয়োগ কার্যকর থাকবে এবং তারা অন্য কোনো ব্যবসা বা চাকরির সাথে যুক্ত থাকতে পারবেন না। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে এভাবে সরাসরি রাজনৈতিক নেতাদের বসিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনের প্রথাগত নিরপেক্ষতার ধারণাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা ও রাজনৈতিক পরিচয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এ টি এম আবদুল বারী ড্যানীকে এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হয়েছেন যুবদলের সাবেক সহসভাপতি কামরুজ্জামান দুলাল। এ ছাড়া বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) প্রধান করা হয়েছে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেককে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা সালাহউদ্দিন সরকার পেয়েছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের দায়িত্ব।
তালিকায় থাকা অন্যান্যদের মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির সহ-বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু)। যুবদলের সাবেক সহসভাপতি জাকির হোসেন (সিদ্দিকী) হয়েছেন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান। একইভাবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ, বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে সাবেক যুবদল নেতা মামুন হাসান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামান (সুরুজ) এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদায়ন পেয়েছেন মো. সামসুল আলম।
প্রশাসনের শীর্ষ পদে বিএনপির নেতাদের এই পদায়নকে কেন্দ্র করে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে মারাত্মক হতাশা দেখা দিয়েছে। সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, টানা ২৫ থেকে ৩০ বছর মেধা ও দক্ষতার সাথে চাকরি করার পর একজন কর্মকর্তা কোনো একটি বড় সংস্থার প্রধান হওয়ার প্রত্যাশা করেন। কিন্তু নিয়মিত পদোন্নতি না দিয়ে এভাবে রাজনৈতিক ভিত্তিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে পুরো ক্যাডার ব্যবস্থার অনুপ্রেরণা ও পেশাগত মনোবল ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বসানো হলে কাজের পরিবেশ নষ্ট হয়।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে সরকার পরিবর্তনের পর দলীয় লোক বসানোর চর্চা নতুন নয়। অতীতে চারদলীয় জোট সরকার কিংবা অন্যান্য সরকারের আমলেও দু-একটি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে দেখা গেছে। তবে একযোগে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ১২ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় বিরল। সরকারি চাকরি আইনের ৪৯ ধারায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান থাকলেও, আমলাতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে একে সচরাচর ‘ব্যতিক্রমী প্রয়োগ’ হিসেবে ব্যবহার করার কথা ছিল, যা এখন সাধারণ নিয়মে পরিণত হতে চলেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিবদের মতে, বিশেষ কোনো প্রযুক্তিগত বা ব্যতিক্রমী দক্ষতার প্রয়োজন হলে সেই কারণ ব্যাখ্যা করে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কারিগরি বা বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা ছাড়া কেবল দলীয় আনুগত্যের কারণে নিয়োগ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্তরা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় অনুসারীদের সুবিধা দিতে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়েন, যা সামগ্রিক সুশাসন ও পেশাদারিত্বকে নড়বড়ে করে দেয়।
অবশ্য সিভিল সার্ভিসের ভেতরের অভ্যন্তরীণ দলাদলি, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং কর্মকর্তাদের প্রতি সরকারের আস্থাহীনতাও এমন নিয়োগের পেছনে একটি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক সময় প্রশাসনিক ক্যাডারদের চরম বিরোধের কারণে সরকার বিকল্প হিসেবে নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তির ওপর ভরসা করার পথ বেছে নেয়। তবে প্রেক্ষাপট যা-ই হোক না কেন, বিএনপির নেতাদের এভাবে একযোগে সরকারি সংস্থায় বসানোর ফলে আমলাতন্ত্র যে নতুন করে রাজনীতিমুখী হচ্ছে এবং পেশাদার কর্মকর্তারা বঞ্চিত বোধ করছেন—তা আর অলক্ষিত থাকছে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার পথকে আরও কঠিন করে তুলবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল