শিরোনামঃ
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩২ পূর্বাহ্ন

এলএনজি টার্মিনাল এখনও অচল, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে ১,৫০০ মেগাওয়াট

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে অবস্থিত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আকস্মিক বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর থেকে সারা দেশে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট ক্রমেই মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এই টার্মিনালটি বিকল হয়ে পড়ার পর থেকে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটি ঠিক করে পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা দিনক্ষণ ঘোষণা করা সম্ভব নয়। টানা বর্ষণ শেষে হঠাৎ করে দেশজুড়ে তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের আকাশচুম্বী চাহিদার বিপরীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যা সার্বিক জনজীবন ও শিল্প উৎপাদনকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চরম ঘাটতির কারণে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় বর্তমানে অন্তত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদিত হচ্ছে। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিনের গ্যাসের বরাদ্দ তীব্রভাবে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যা ঘণ্টাভিত্তিক পরিবর্তিত হচ্ছে। কিছুদিন আগেও যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিদিন গড়ে ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেত, সেখানে বর্তমানে বরাদ্দ কমে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। ন্যাশনাল লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে, দুপুরের পর থেকে বিদ্যুতের ঘাটেতি এক হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করে ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র দাবদাহ; শ্রীমঙ্গল ও দেশের বড় অংশজুড়ে তাপমাত্রা হঠাৎ ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যাওয়ায় বিদ্যুৎ না থাকার যন্ত্রণা সাধারণ নাগরিকে তীব্রভাবে ভোগাচ্ছে।

বিদ্যুৎ সংকটের চেয়েও বড় আঘাত এসেছে দেশের শিল্প খাত ও গৃহস্থালি রান্নার গ্যাস সরবরাহে। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতের জন্য প্রতিদিন প্রায় ২,৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সুনির্দিষ্ট চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৭০৬ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। অর্থাৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চাহিদার বিপরীতে মাত্র ২৭ থেকে ২৮ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ মিলছে, যার ফলে বহু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি অলস বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। শিল্প কারখানাগুলোর কাঁচামাল এবং বিদ্যুতের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা তাদের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, আর অন্য কারখানাগুলো চড়া দামে জ্বালানি কিনে উৎপাদন চালু রাখায় তাদের উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এর পরোক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজার অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

দেশের সার কারখানাগুলোও এই সংকট থেকে রেহাই পাচ্ছে না; স্বাভাবিক চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ গ্যাস দিয়ে কোনোমতে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট পুনর্সংযোজিত এলএনজি সরবরাহ করা যেত, তা কমে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, কারিগরি ত্রুটিটি বেশ জটিল প্রকৃতির। শট সার্কিটের কারণে টার্মিনালের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক ক্যাবল ও আধুনিক সরঞ্জাম পুড়ে যাওয়ায় মেরামতের কাজ করতে প্রকৌশলীদের অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। টেকনিশিয়ানরা একটানা কাজ চালিয়ে গেলেও এটি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ঠিক কত দিন বা কত সপ্তাহ লাগবে তা এখনই নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন না।

গ্যাসের এই তীব্র সংকটের ঢেউ এসে পড়েছে পরিবহন খাতেও। কম প্রেসারের কারণে রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সিরাজগঞ্জ বা অন্যান্য জেলা শহরগুলোতে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। লাইন প্রেসার প্রায় শূন্যে নেমে আসায় অনেক পাম্প পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে, ফলে গণপরিবহন ও সিএনজিচালিত গাড়িগুলোকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গ্রাহকদের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানিয়েছে যে, টার্মিনালটি চালু না হওয়া পর্যন্ত বাসাবাড়িসহ সব শ্রেণির গ্রাহকদেরই গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ এই একটি দুর্ঘটনার কারণে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

এদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত এবং পুরো অর্থনীতি যেভাবে বারবার জিম্মি হয়ে পড়ছে, তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করছেন, কেবল একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পুরো দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়া দেশের অদূরদর্শী জ্বালানি নিরাপত্তার চূড়ান্ত দুর্বলতাকে প্রকাশ করে। দেশে অনাবাদি ও নির্ধারিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো যদি সময়মতো বাস্তবায়ন করা যেত, তবে আজ জাতীয় গ্রিডে বাড়তি কয়েক হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত থাকত। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরাসরি চাহিদা কমত এবং সেই বাঁচানো গ্যাস অনায়াসে শিল্প ও সার কারখানায় সরবরাহ করা যেত। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈদেশিক এলএনজি আমদানির ওপর অন্ধ নির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। একই সাথে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো এবং সৌর শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এমন কারিগরি দুর্ঘটনা দেশের অর্থনীতির বড় ধরনের বড় ক্ষতি ডেকে আনবে।

তথ্যসূত্র: নিউ এইজ


এ জাতীয় আরো খবর...