শিরোনামঃ
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:৩১ পূর্বাহ্ন

জুলাই আন্দোলনের ভুয়া মামলায় বাদীদের সাজা দেয়ার তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬
July Uprising

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দায়ের করা মামলায় ব্যাপকভাবে জালিয়াতি, ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার ও নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘ তদন্তে একের পর এক মিথ্যা অভিযোগ, বানানো ঘটনা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাবশত দায়ের করা মামলার বিবরণ উন্মোচিত হওয়ার পর এবার জালিয়াতি করা বাদী ও প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বেশ কিছু মামলায় দেখা গেছে, বাস্তবে বেঁচে থাকা মানুষদের মৃত দেখিয়ে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বৈবাহিক কোন্দল, জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিশাল তালিকার সঙ্গে অসৎ উদ্দেশ্যে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নিরীহ মানুষদের নাম। পুলিশ জানিয়েছে, এসব ভুয়া মামলার পাহাড় থেকে প্রকৃত অপরাধী ও ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের কালঘাম ছুটছে এবং এতে আসল বিচারপ্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আদালতে সরাসরি সিআর বা নালিশি হিসেবে দায়ের করা ব্যক্তিগত মামলাগুলোতেই এই জালিয়াতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনেক বাদী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রভাবশালীদের উসকানিতে বা টাকার বিনিময়ে মামলায় নাম ঢোকানো ও কাটার মতো ‘মামলা বাণিজ্য’ চালিয়ে গেছেন। আশুলিয়ার এক নারী তাঁর স্বামীকে মৃত দাবি করে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন, কিন্তু পরবর্তীতে পুলিশ অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে যে তাঁর স্বামী বহাল তবিয়তে বেঁচে আছেন। স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার কথায় প্ররোচিত হয়ে আসামি তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেছিলেন ওই নারী। উত্তরা, মিরপুর, বংশাল এমনকি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন থানাতেও এমন বহু ঘটনা দেখা গেছে যেখানে বিদেশ অবস্থানরত ব্যবসায়ী বা বহু বছর আগে মারা যাওয়া মানুষকেও হত্যা মামলায় নতুন করে আসামি করা হয়েছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের করা মোট ১,৮৬২টি মামলার মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ২৫৪টির তদন্ত শেষ করতে পেরেছে পুলিশ। শতাংশের হিসাবে মামলা নিষ্পত্তির এই হার মাত্র ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর মধ্যে মোট ৭৯৯টি হত্যা মামলার মধ্যে মাত্র ১০০টির কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে ৬৩টিতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা পড়েছে এবং ৩৭টি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি বা খারিজ করা হয়েছে। বাকি ১,০৬৩টি অনাকাক্সিক্ষত সহিংসতা ও আহত হওয়ার মামলার মধ্যে সমাধান হয়েছে মাত্র ১৫৪টির। তদন্ত চলাকালীন পুলিশের অফিশিয়াল যাচাই-বাছাইয়েই সরকারি তালিকা থেকে ১৩ জন কথিত শহীদের নাম বাদ দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে ৫ জন ছিলেন সম্পূর্ণ জীবিত এবং বাকি ৮ জনের তথ্য ছিল কাল্পনিক অথবা দ্বৈত।

সর্বশেষ তদন্তে উঠে এসেছে যে অন্তত ১০২টি মামলা পুরোপুরি ভুয়া এবং তা স্রেফ নিরীহ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল বা রাজনৈতিক হয়রানি করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছিল। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নালিশি মামলাগুলোর প্রায় ৬৪ শতাংশে আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো প্রাথমিক সত্যতা খুঁজে পায়নি। ১৪২টি তদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যে ৫২টি মামলায় সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি এবং ১৪টি মামলা ছিল একশ ভাগ বানোয়াট। তদন্ত কর্মকর্তারা মোবাইল কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ঘটনার দিন বা সময়ে অভিযুক্তদের বড় অংশ দুর্ঘটনাস্থলের কাছাকাছিও ছিলেন না। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে মিথ্যা মেডিকেল সার্টিফিকেট তৈরি করে নিরীহ মানুষকে ফাঁসানোর প্রমাণও পিবিআই হাতে পেয়েছে।

এই বিশাল জালিয়াতি এবং ঢালাও আসামি তালিকার কারণে থানাগুলোতে চরম প্রশাসনিক সংকট ও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। একই সাথে শত শত নামজাদা ও সাধারণ মানুষকে এক মামলায় অভিযুক্ত করায় থানা পর্যায়ে মামলার জট ফাইল হয়ে জমে আছে। যেমন সাভার থানাতেই ৪৩টি আলাদা হত্যা মামলার তদন্ত চললেও কর্মকর্তা ও সম্পদের তীব্র সংকটের কারণে মাত্র দুটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব হয়েছে। একক তদন্ত কর্মকর্তাদের একসাথে ১০ থেকে ১২টি জটিল হত্যা মামলার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া মামলা দিয়ে আসামিদের থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ‘মামলা বাণিজ্য’ চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসামি বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাদী ও তদন্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ৩০০ বা ৩৫০ টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আপসনামা বানিয়ে আদালতে জমা দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার আরেকটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফরেনসিক প্রমাণের ঘাটতি ও ময়নাতদন্ত না হওয়া। আন্দোলনকালীন নিহত হওয়া ব্যক্তিদের সিংহভাগকেই ঘটনার পরপরই ময়নাতদন্ত ছাড়া দাফন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আইনি ও বিচারিক সুবিধার্থে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের উপস্থিতিতে কবর থেকে লাশ তুলে ফরেনসিক পরীক্ষা বা পোস্টমর্টেম করার উদ্যোগ নেওয়া হলে নিহতের স্বজন ও বিক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তা পণ্ড হয়ে যায়। কুষ্টিয়া, পাবনা, জামালপুর এবং সাভারে শহীদের মরদেহ তুলে ময়নাতদন্তের চেষ্টা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, মামলাগুলোতে উপযুক্ত ফরেনসিক বা ডাক্তারি প্রমাণ না থাকলে মূল অপরাধীরা আদালতের আইনি ফাঁকফোকর গলে সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ভিত্তিহীন মামলায় ফেঁসে যাওয়া শত শত সাধারণ নাগরিককে আইনি সুরক্ষা দিতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩এ (Section 173A) ধারার ব্যবহার বাড়িয়েছে পুলিশ। পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, যেসব নাগরিক অসৎ উদ্দেশ্যে জালিয়াতির শিকার হয়েছেন, তারা এই ধারায় অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করতে পারছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রাথমিক সত্যতা না পেলে সরাসরি আদালতে ভুক্তভোগীদের নাম বাদ দিয়ে অব্যাহতি সুপারিশ করতে পারবেন। তবে যারা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ও বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছিলেন, তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না; পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, ভিত্তিহীন মামলা ও ব্ল্যাকমেইলিং চালানো এসব ভুয়া বাদীদের বিরুদ্ধে সিআরপিসির উপযুক্ত ধারায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনিক শাস্তির সুপারিশ আদালতকে নিয়মিত জমা দেওয়া হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: টাইমস অফ বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...