রবিবার, ০২ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন

চট্টগ্রামে এস আলম গ্রুপের ১১ কারখানা বন্ধ: একদিনেই ৬ হাজার শ্রমিক বেকার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে হঠাৎ করেই নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়বিদারক স্থবিরতা। দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক সংস্থা এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ১১টি বিশাল উৎপাদনমুখী কারখানা একদিনেই একযোগে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। টানা দুই বছর ধরে কাঁচামালের চরম সংকট এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের ফলে সৃষ্ট আর্থিক জটিলতায় আর কুলিয়ে উঠতে না পেরে কর্তৃপক্ষ এক আদেশে এই কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই একক সিদ্ধান্তের ফলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আক্ষরিক অর্থেই বেকার ও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা। একদিনের ব্যবধানে এত বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের চাকরি হারানোর ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম তথা দেশের শিল্প খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও পটিয়া শিল্প এলাকায় অবস্থিত এই কারখানাসমূহে এতদিন কর্মমুখর পরিবেশ থাকলেও গত ৩০ জুলাই থেকে সেখানে নেমে এসেছে সুনসান নিরবতা। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে ৬ হাজার শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে নিপতিত। বিপুল সংখ্যক পরিবার সরাসরি এই একটি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় স্থানীয় শ্রমবাজারে তীব্র শোক ও দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছে। কর্মহীন হয়ে পড়া হাজার হাজার কর্মী ও তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

শিল্পাঞ্চলের দায়িত্বশীল সূত্র এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই আকস্মিক ও বিশাল বেকারত্বের ঘটনাটি রাতারাতি ঘটেনি; বরং এটি ছিল দীর্ঘ দুই বছর ধরে জমে থাকা অপারেশনাল ও প্রশাসনিক সংকটের এক চূড়ান্ত ও ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে এস আলম গ্রুপের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংকিং লেনদেনের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ জারি করা হয়। এর ফলে বিদেশে নতুন করে কোনো এলসি বা ঋণপত্র খোলা কিংবা সরাসরি কাঁচামাল আমদানি করার পথ পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এতদিন গুদামে থাকা অতিরিক্ত কাঁচামাল দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সীমিত উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সেই জমানো কাঁচামালের মজুদ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পর কারখানা সচল রাখার আর কোনো শারীরিক বা আইনি সুযোগ কর্তৃপক্ষের হাতে অবশিষ্ট ছিল না। ফলে নিরুপায় হয়ে একদিনেই ১১টি কারখানায় তালা ঝুলিয়ে দিতে হয়, যার করুণ মাশুল গুনতে হলো ৬ হাজার নিরীহ শ্রমিককে।

তবে একদিনেই ৬ হাজার শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য হলেও, তাদের আইনগত প্রাপ্য পাওনা মেটানোর বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। এস আলম গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, চাকরি হারানো সমস্ত শ্রমিকের বকেয়া বেতন, আইনগত সুবিধা এবং চাকরির সার্ভিস বেনিফিট বা গ্র্যাচুইটির পুরো টাকা আগামী ৬ আগস্টের মধ্যে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এর আগেও কাঁচামালের অভাবে কারখানাগুলো নামমাত্র সচল থাকার সময় দফায় দফায় বহু শ্রমিককে পাওনা পরিশোধ করে সম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, একজন কর্মী তাঁর চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৭ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ লাখ, এমনকি ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন গ্র্যাচুইটি ও ভাতা পেয়েছিলেন। বর্তমান কর্মহীন ৬ হাজার শ্রমিকের বকেয়াও একইভাবে ৬ আগস্টের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করার পক্রিয়া দ্রুতগতিতে চালানো হচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য উৎপাদন না থাকা সত্ত্বেও এস আলম গ্রুপ তাদের মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দিক বিবেচনা করে কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করে আসছিল। কোনো উৎপাদন ছাড়াই প্রতি মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার বিপুল অঙ্কের বেতন ভাতা দিয়ে আসছিল তারা। কিন্তু মাসের পর মাস কারখানা পুরোপুরি বসে থাকার পর, কোনো প্রকার কাঁচামাল বা নতুন রাজস্ব ব্যতিরেকে কোটি কোটি টাকার মাসিক পে-রোল সচল রাখা যে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্যই অসম্ভব একটি বিষয়। দীর্ঘ দু বছর কারখানা অলস বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়ার পর অবশেষে একদিনেই সেই চূড়ান্ত ও অপ্রিয় সিদ্ধান্তটি নিতে হয় কর্তৃপক্ষকে, যা এক ধাক্কায় ৬ হাজার মানুষকে বেকারত্বের করুণ বাস্তবতার দিকে ঠেলে দেয়।

বন্ধ হয়ে যাওয়া এই ১১টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য ও নির্মাণ সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ। এর মধ্যে রয়েছে এস আলম রিফাইনড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম ব্যাগ ফ্যাক্টরি, একটি উন্নত ফিড মিলসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিট। তবে সার্বিক উৎপাদন কার্যক্রম ও কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও, নিজস্ব বিদ্যুৎ ও জরুরি অবকাঠামোগত নিরাপত্তা বজায় রাখতে গ্রুপটির মালিকানাধীন পাওয়ার প্ল্যান্টটি এখনো সচল রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা একদিনে ৬ হাজার মানুষের চাকরি হারানোর এই ঘটনাটিকে কেবল একটি শিল্প গ্রুপের সংকট হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি পুরো দেশের অর্থনীতি, শিল্প খাত এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের সংকেত। একদিনে এতগুলো পরিবার রোজগার হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হওয়ায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও খুচরা বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ভুক্তভোগী ৬ হাজার বেকার শ্রমিক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা জোর দাবি জানিয়েছেন যে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক বিভাগ যেন বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে কারখানাগুলোর কাঁচামাল আমদানি ও ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় অন্তত সীমিত পরিসরে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। বিশেষ আইনি ছাড় বা সরকারি পুনর্বাসন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা হলে হয়তো এই বন্ধ হওয়া ১১টি কারখানা আবারও সচল হতে পারে, আর তবেই একদিনে বেকার হয়ে পড়া ৬ হাজার শ্রমিকের ঘরে আবার ফিরে আসতে পারে অন্ন ও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

তথ্যসূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


এ জাতীয় আরো খবর...