শিরোনামঃ
আমাদের মোহিত কামাল ভাই জেলা পরিষদের প্রশাসক-চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিশ্চিতে ডিসিদের নির্দেশ পাবনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বরিশালের বাকেরগঞ্জে বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব এককভাবে কারও নয়: রিজভী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় ইসি: ইসি সচিব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা: প্রতিমন্ত্রী জুলাইয়ে রেকর্ড বৃষ্টির পর আগস্টে তাপপ্রবাহ ও বন্যার ঝুঁকি খেলাধুলার মাধ্যমে মাদক-অপরাধ থেকে দূরে থাকবে তরুণরা: ত্রাণমন্ত্রী ওজন কমাতে কোন ব্যায়ামে মিলবে বেশি উপকার
মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৬ পূর্বাহ্ন

গ্যাস সংকট নিরসনে নতুন উদ্যোগ: মিয়ানমার থেকে গ্যাস আনতে চায় সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৮ বার
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

দেশের চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট নিরসন এবং শিল্প-কারখানাসহ সার্বিক অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে সরাসরি গ্যাস আমদানির এক নতুন প্রশাসনিক ও কৌশলগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সীমান্তের ওপার থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আনার প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জবাবে মিয়ানমার সরকারও বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহ বা রপ্তানি করার বিষয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করেছে এবং তারা বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) বিক্রির এক প্রস্তাব সামনে এনেছে। দুই দেশের এই দুটি আলাদা বাণিজ্যিক প্রস্তাবনার সার্বিক সম্ভাব্যতা এবং কারিগরি সুযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে খুব শিগগিরই শীর্ষ মন্ত্রী পর্যায়ে একটি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত জ্বালানি সহযোগিতা সংক্রান্ত এক বিশেষ দ্বিপক্ষীয় সভায় মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়। সভার তথ্য নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে তাঁর দেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির ব্যাপারে পূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্মতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সভায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তাঁর সাথে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে মিয়ানমার প্রতিনিধিদলে রাষ্ট্রদূতের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন দেশটির কমার্শিয়াল কাউন্সিলর মিয়াত লউইন।

বৈঠককালে বাংলাদেশের জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলকে স্পষ্ট জানান যে, দ্রুত রূপান্তরশীল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের এক বিশাল ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখতে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহন ও সংগ্রহের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করছে। এই যৌথ লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা তৈরি করতে খুব দ্রুতই মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বাংলাদেশে আসার সুনির্দিষ্ট আমন্ত্রণ জানানো হবে। এ সময় যৌথ কারিগরি কমিটির (Joint Technical Committee) বিশেষ সভা ডেকে পুরো বিষয়টি প্রযুক্তিগত ও ভৌগোলিক দিক থেকে পর্যালোচনা করার প্রস্তাব দেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত।

বর্তমানে ভৌগোলিক অবস্থান বিচারে মিয়ানমার বাংলাদেশের একেবারে সীমান্তঘেঁষা প্রতিবেশী এবং প্রধানতম গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও, বাংলাদেশকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চড়া মূল্যে মধ্যপ্রাচ্য ও বহুদূরের বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করতে হয়। এত বিশাল ব্যয়ের পরও অভ্যন্তরীণ দৈনন্দিন ঘাটতি মেটানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দৈনিক অন্তত ৩৮০ কোটি ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাসের চরম চাহিদা থাকলেও এর বিপরীতে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২৭০ থেকে ২৮০ কোটি ঘনফুট। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভর করে প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনালে আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ফলে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ হয়ে দেশজুড়ে নজিরবিহীন বিপর্যয় তৈরি হয়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের শিল্প খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন, গণপরিবহন এবং সাধারণ নাগরিকদের বাসা-বাড়ির রান্নার ওপর।

এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ সরকার কেবল মিয়ানমারেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাশাপাশি মালয়েশিয়ার সঙ্গেও গ্যাস আমদানির নতুন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। মূলত ছোট আকারের বিশেষায়িত কার্গো জাহাজে করে মালয়েশিয়া থেকে এলএনজি এনে অভ্যন্তরীণ নৌপথের মাধ্যমে সমস্যাপ্রবণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে দ্রুত পৌঁছানোর একটি সম্ভাবনাময় কৌশল বিবেচনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বৈঠকে সম্প্রতি শেষ হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের একটি বিশেষ আলোচনার বিষয় স্মরণ করিয়ে দেন জ্বালানি মন্ত্রী। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য যে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ’ বিশেষ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ করিডর তৈরির ধারণাগত প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, তার সাথে যৌথ গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন করা হলে তা পুরো অঞ্চলে এক বৈপ্লবিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করবে।

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাত ও গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও প্রাকৃতিক সম্পদ সরবরাহের বিচারে মিয়ানমার এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে অবস্থান বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী, বর্তমানে দলটি প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও চীনে বার্ষিক প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের জ্বালানি গ্যাস নিয়মিত পাঠায়, যা তাদের মোট রপ্তানি আয়ের দিক থেকে তৈরি পোশাক খাতের পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘বিজনেস টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, মিয়ানমারের সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক সীমায় এ পর্যন্ত বড় আকারের ৪টি সমৃদ্ধ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ক্ষেত্র থেকে সরাসরি সাগরের তলদেশ দিয়ে থাইল্যান্ডে প্রাকৃতিক জ্বালানি পরিবাহিত হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের পার্বত্য সীমান্তসংলগ্ন ও রাখাইন রাজ্য ঘেঁষা বঙ্গোপসাগরের বিশেষ গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরাসরি স্থলপথের মাধ্যমে চীনে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

এই ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ বিবেচনায় এনে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি কার্যকর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি পাইপলাইন অথবা এলএনজি আমদানির একটি দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তবে দূরবর্তী দেশগুলো থেকে চড়া মূল্যে শিপিং চালানে এলএনজি আনার বিশাল খরচ অনেকখানি কমে আসবে। এটি একই সাথে দুই দেশের মধ্যবর্তী কূটনৈতিক বৈরিতা হ্রাসে সাহায্য করবে, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং দেশীয় বিদ্যুৎ ও উৎপাদনশীল শিল্প খাতের জ্বালানি সংকট দূর করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এক ঐতিহাসিক ট্রানজিশন বা রূপান্তর হিসেবে কাজ করবে।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...