শিরোনামঃ
ছাত্রদলের ক্যাম্পাস, ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে: জবি ভিসিকে শাসালেন ছাত্রদল নেতা ১০টি পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে: তথ্য উপদেষ্টা শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে অবস্থান জানাল দিল্লি ৬ গিগাহার্জ ব্যান্ডের ৭০০ মেগাহার্জ ওয়াই-ফাইয় উন্মুক্তে আপত্তি বিটিআরসির ১৩ বছরের সর্বনিম্ন: বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ৩৭% হ্রাস নাগরিক সেবায় কোটা ব্যবস্থার অমীমাংসিত বিতর্ক: দুই বছর পরো সংস্কার নিয়ে স্থবিরতা রাজনৈতিক বিবেচনায় ২৬৫ ডিএজি-এএজি নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জে রিট
বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০০ পূর্বাহ্ন

উচ্চশিক্ষায় অ্যাকাডেমিক দায়বদ্ধতার সংকট: বিপুল অনুদান পেলেও জমা পড়েনি বহু শিক্ষকের গবেষণার প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অর্থায়নে পরিচালিত শত শত গবেষণা প্রকল্পে চরম উদাসীনতা ও জবাবদিহিহীনতার এক আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি কোষাগারের বিপুল অংকের অর্থ অনুদান হিসেবে গ্রহণ করার পরও নির্ধারিত মেয়াদ পার হয়ে বছরের পর বছর কেটে গেলেও চূড়ান্ত গবেষণা প্রতিবেদন জমা না দেওয়ার প্রবণতা এখন উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক পাঁচ অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অনুমোদিত দেড় শতাধিক গবেষণা প্রকল্পের কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে কেবল সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়েই প্রশ্ন উঠছে না; বরং উচ্চশিক্ষায় গবেষণা কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং শিক্ষক সমাজের মৌলিক নীতি-নৈতিকতাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইউজিসির অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় মোট ৪৮২টি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছিল। তবে অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে এর মধ্যে অন্তত ১৫৮টি প্রকল্পের চূড়ান্ত গবেষণা প্রতিবেদন আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হয়নি। শতকরা হিসেবে যা মোট অনুমোদিত প্রকল্পের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা প্রতি তিনটি প্রকল্পের একটি। প্রকল্প ভেদে সর্বনিম্ন সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেই টাকার সুনির্দিষ্ট কোনো ফলাফল বা গবেষণাপত্র দেখতে পাননি দেশের মানুষ। সব মিলিয়ে অলস বা অনিষ্পন্ন থেকে যাওয়া এই গবেষণা প্রকল্পগুলোতে জড়িত রয়েছে সরকারি রাজস্বের প্রায় ৫ কোটি টাকা।

তবে এই অনিয়মের চেয়েও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যায় প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকা ও তথ্য গোপনের মানসিকতা। নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও যেসব শিক্ষক বা গবেষক প্রকল্পের চূড়ান্ত কাজ শেষ করেননি বা প্রতিবেদন জমা দেননি, তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করতে চরম অনীহা প্রদর্শন করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী সাংবাদিক বা অনুসন্ধানকারীদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তালিকা চেয়ে লিখিত আবেদন করা হলেও তা জনসংযোগ দপ্তর, রেজিস্টার অফিস ও হিসাব দপ্তরের নানা আমলাতান্ত্রিক টেবিলে মাসের পর মাস ঘুরপাক খেয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোষাধ্যক্ষের দপ্তর থেকে শুধুমাত্র অসম্পূর্ণ সংখ্যাভিত্তিক তথ্য দেওয়ার অনুমতি মিললেও খেলাপি শিক্ষকদের নামের তালিকা বা তাদের বিভাগের নাম প্রকাশে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যায় সচেতন শিক্ষক সমাজের অভিযোগ, এই তালিকায় সাবেক ও বর্তমান একাধিক উপাচার্য, উচ্চপদে আসীন প্রভাবশালী অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের নাম যুক্ত থাকায় প্রশাসন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের আড়াল করার চেষ্টা করছে।

নিয়ম অনুযায়ী ইউজিসির অর্থায়নে পরিচালিত এসব প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রকল্পের মেয়াদকাল হয়ে থাকে সাধারণত এক বছর। কোনো বিশেষ ও যুক্তিসঙ্গত কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করা না গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সময়সীমা বাড়ানোর নিয়ম থাকলেও, মেয়াদশেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। শিক্ষা ও গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না পড়লে গবেষণার মূল লক্ষ্য অর্জিত হলো কি না, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হলো কি না কিংবা এই গবেষণা থেকে দেশ ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে কোনো নতুন সুফল বা জ্ঞান পাওয়া গেল কি না—তা পুরোপুরি অজানাই থেকে যায়। এতে সরকারি অর্থের যথেচ্ছ অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট সুযোগ তৈরি হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এই পুরো প্রক্রিয়াকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অপরাধমূলক কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, গবেষণার কথা বলে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা নিয়ে প্রতিবেদন জমা না দেওয়া একটি বড় ধরনের অন্যায়, এবং সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই প্রচলিত আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধির আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছে গবেষণায় অবদান রাখার চেয়ে প্রশাসনিক পদ-পদবি ও প্রভাব অর্জনের প্রতিযোগিতা মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যের মতো লোভনীয় প্রশাসনিক পদ পাওয়ার ইঁদুরদৌড়ে মূল অ্যাকাডেমিক চর্চা ও গবেষণার গুরুত্ব ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম তিন অর্থবছরে প্রকল্পের সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও ২০২৩ সাল পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বরাদ্দের পরিমাণ এবং প্রকল্পের সংখ্যা হঠাৎ করেই বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিপুল অংকের টাকা ছাড় করা সত্ত্বেও গবেষণার সার্বিক মূল্যায়নে চরম স্থবিরতা দেখা যায়। এর জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন যে ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণা অনুদানের সঠিক বণ্টন, অর্থের ব্যবহার ও প্রতিবেদন জমাদানের সামগ্রিক বিষয় খতিয়ে দেখতে একটি পৃথক শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অতীতে ঘটে যাওয়া আর্থিক ও অ্যাকাডেমিক অনিয়মের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গবেষণা শেষ করতে না পারলে বা কোনো শিক্ষক প্রকল্প ত্যাগে বাধ্য হলে বিধিমালা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দেওয়ার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এই নিয়ম কতটা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন শত শত শিক্ষক সরকারি অনুদান নিয়ে নীরব থাকেন এবং প্রশাসনও তাদের নাম প্রকাশ না করে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, তখন তা নতুন গবেষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে অত্যন্ত ভুল ও অনৈতিক বার্তা পাঠায়। উচ্চশিক্ষার মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং গবেষণার আন্তর্জাতিক মান সুনিশ্চিত করতে হলে অনতিবিলম্বে এসব অনিষ্পন্ন প্রকল্পের শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং বরাদ্দকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...