শিরোনামঃ
ছাত্রদলের ক্যাম্পাস, ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে: জবি ভিসিকে শাসালেন ছাত্রদল নেতা ১০টি পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে: তথ্য উপদেষ্টা শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে অবস্থান জানাল দিল্লি ৬ গিগাহার্জ ব্যান্ডের ৭০০ মেগাহার্জ ওয়াই-ফাইয় উন্মুক্তে আপত্তি বিটিআরসির ১৩ বছরের সর্বনিম্ন: বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ৩৭% হ্রাস নাগরিক সেবায় কোটা ব্যবস্থার অমীমাংসিত বিতর্ক: দুই বছর পরো সংস্কার নিয়ে স্থবিরতা রাজনৈতিক বিবেচনায় ২৬৫ ডিএজি-এএজি নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জে রিট
বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

নাগরিক সেবায় কোটা ব্যবস্থার অমীমাংসিত বিতর্ক: দুই বছর পরো সংস্কার নিয়ে স্থবিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসসহ সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতির সুষম সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এই জটিল সমস্যার কোনো স্থায়ী বা গ্রহণযোগ্য সমাধান এখনো অর্জিত হয়নি। বিগত সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে প্রণয়ন করা ৭ শতাংশের বর্তমান কোটা ব্যবস্থাটি মূলত একটি সাময়িক ও অসম্পূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই রয়ে গেছে, যা নারীদের এবং বিভিন্ন জাতীয় বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সঠিক প্রতিনিধিত্বকে মারাত্মকভাবে পাশ কাটিয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত উচ্চপর্যায়ের রিভিউ বা পর্যালোচনা কমিটি নামমাত্র কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এই অমীমাংসিত ইস্যুটি নিয়ে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। ফলে কোটা সংস্কারের যে মূল দাবিকে সামনে রেখে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল, তা আজও ঝুলে রয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক তথ্যাদি থেকে জানা যায়, কোটা ব্যবস্থার সামগ্রিক মূল্যায়ন ও এর বাস্তবসম্মত সংস্কারের সুপারিশ দেওয়ার জন্য বিগত অন্তর্বর্তী প্রশাসনের আমলে একটি ১১ সদস্যের শক্তিশালী পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদের নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের মার্চের শেষ দিকে গঠিত এই কমিটিকে ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এ ধরনের কোনো পর্যালোচনা কমিটির অস্তিত্ব বা তাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বর্তমান প্রশাসনের কাছে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য বা নথি নেই। দায়িত্ব পরিবর্তনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ফাইলপত্র ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা হারিয়ে যাওয়ার ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগটি সম্পূর্ণ ফাইলবন্দী হয়ে পড়েছে।

বর্তমান நடைল অনুযায়ী, সরকারি চাকুরিতে মোট পদের মাত্র ৭ শতাংশ কোটার জন্য সংরক্ষিত রয়েছে, যার মধ্যে ৫ শতাংশ বরাদ্দ বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের সন্তানদের জন্য, ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা জাতীয় সংখ্যালঘুদের জন্য এবং বাকি ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ও ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য। এই কাঠামোতে নারীদের জন্য আলাদা কোনো সুনির্দিষ্ট কোটা সংরক্ষিত না থাকায় সার্বিক প্রশাসনিক চাকরিতে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর বাইরে অবশিষ্ট ৯৩ শতাংশ শূন্য পদ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত মেধা তালিকার ভিত্তিতে পূরণ করার নিয়ম চালু রয়েছে। অথচ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের জমা দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে মোট সরকারি চাকুরিজীবীর মধ্যে নারীর অনুপাত মাত্র ২৮ শতাংশের কাছাকাছি। বিশেষ করে নবম থেকে দ্বাদশ গ্রেডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদগুলোতে নারী চাকরিজীবীর হার নামমাত্র ৭ শতাংশের কোঠায় আটকে আছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক ও সাবেক ছাত্রনেতারা মনে করছেন যে, ছাত্র সমাজের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত কোটা সংস্কারের প্রধান এজেন্ডাটি আজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সাবেক ছাত্রনেতা ও ছাত্র শক্তির নেতৃবৃন্দ বলছেন যে, কোটার সামগ্রিক ঊর্ধ্বসীমা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত নারী এবং প্রান্তিক জনপদের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সংরক্ষণ ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে জেলা কোটা বা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় সংরক্ষণ বাদ দিয়ে কেবল মেধা এবং পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য একটি সুষম ১০ শতাংশের ভেতর কোটা কাঠামো সীমিত করার প্রস্তাব তখনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা বর্তমান নির্বাচিত সরকার—কোনো পক্ষই এই অংশীজনদের সাথে কোনো ধরনের অর্থবহ আলোচনা বা পরামর্শ করার প্রয়োজন বোধ করেনি, যা নাগরিকদের মধ্যে চরম আস্থার সংকট তৈরি করছে।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও জাতীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিনিধিরা বলছেন যে, কোটা কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার পর থেকেই সরকারি চাকুরিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। সর্বশেষ বিসিএস ক্যাডার বা অন্যান্য সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থী মেধার লড়াইয়ে টিকে চাকরি লাভ করতে পেরেছেন, যা বিগত বছরগুলোর তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। একইভাবে, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছেন যে, কোটা পদ্ধতি কেবল কিছু অঙ্কের হিসেব বা কোটা পূরণের বিষয় নয়; বরং এটি নারী empowerment বা নারীর ক্ষমতায়ন এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার পূর্বশর্ত। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন করতে হলে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে সমতা নিশ্চিত করতে হলে জেন্ডারভিত্তিক ইতিবাচক পদক্ষেপ বা affirmative action বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।

কোটা ব্যবস্থার এই দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৯৭২ সাল থেকেই শুরু হওয়া এই কোটা কাঠামো বিভিন্ন সময়ে নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশে উন্নীত হলেও ২০১৮ সালের তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকার সব ধরনের কোটা বাতিল করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে হাইকোর্টের এক রায়ে সেই কোটা পুনর্বহালের আদেশ আসার পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশজুড়ে যে বিশাল ছাত্র বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তা শেষ পর্যন্ত এক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে পূর্বের স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসন আদালতের রায় অনুযায়ী ৭ শতাংশ কোটার যে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল, সরকার বদলের পরেও বর্তমান প্রশাসনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিগুলোতে সেই একই নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চপর্যায়ে স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এবং বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে কোটা সংস্কারের অমীমাংসিত প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি চাকুরিতে অনগ্রসর নারী, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও আধুনিক কোটা নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, যে বৈষম্য দূর করার ব্রত নিয়ে তরুণ সমাজ রাজপথে রক্ত দিয়েছিল, সেই ক্ষোভ ও হতাশা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...