শিরোনামঃ
ছাত্রদলের ক্যাম্পাস, ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে: জবি ভিসিকে শাসালেন ছাত্রদল নেতা ১০টি পর্যবেক্ষণ বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে সহযোগিতার আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচার করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে: তথ্য উপদেষ্টা শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে অবস্থান জানাল দিল্লি ৬ গিগাহার্জ ব্যান্ডের ৭০০ মেগাহার্জ ওয়াই-ফাইয় উন্মুক্তে আপত্তি বিটিআরসির ১৩ বছরের সর্বনিম্ন: বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ৩৭% হ্রাস নাগরিক সেবায় কোটা ব্যবস্থার অমীমাংসিত বিতর্ক: দুই বছর পরো সংস্কার নিয়ে স্থবিরতা রাজনৈতিক বিবেচনায় ২৬৫ ডিএজি-এএজি নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জে রিট
বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:০২ পূর্বাহ্ন

১৩ বছরের সর্বনিম্ন: বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ৩৭% হ্রাস

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক সাহায্য ও নতুন প্রজেক্টের ঋণের আশ্বাস বা প্রতিশ্রুতির পরিমাণ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা বিগত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিভাগ (ইআরডি)-এর প্রকাশিত সর্বশেষ সাময়িক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বৈশ্বিক অর্থায়নকারী সংস্থা ও বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ মাত্র ৫.২৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) ৮.৩২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই ছাড়পত্রের আশ্বাস এক বছরেই প্রায় ৩৭ শতাংশ বা ৩.০৮ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। ২০১৩ সালের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বাংলাদেশকে এত কম অঙ্কের উন্নয়ন সহায়তার আশ্বাস দেওয়ার নজির আর নেই, যা সরকারের দীর্ঘমেয়াদী বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ইআরডি-এর প্রাক্কলিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ সরকারের ঝুলিতে আসা মোট ৫.২৪ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫.০১ বিলিয়ন ডলার এবং সরাসরি অনুদানের পরিমাণ মাত্র ২৩৩.৭৮ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বস্ত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেয়েছিল ৪.৭৬ বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫.৮৫ বিলিয়ন ডলারে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন চুক্তি বা সহায়তার প্রতিশ্রুতি এই অভূতপূর্ব হারে কমে যাওয়ার ফলে দেশের বৈদেশিক সহায়তার পাইপলাইন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এর ফলে আগামী অর্থবছরগুলোতে বৈদেশিক অর্থায়নে পরিচালিত বড় বড় মেগা অবকাঠামো এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রজেক্টগুলোর গতি স্থবির হয়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নতুন ঋণের আশ্বাস কমার পাশাপাশি ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর থেকে অর্থ ছাড় (ডিসবার্সমেন্ট) এবং নিট ঋণের প্রবাহেও বড় ধরনের ধস দেখা গেছে। বিদায়ী অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশকে মোট ৮.০৭ বিলিয়ন ডলারের ছাড়কৃত অর্থ পাঠিয়েছে, যা তার আগের বছরের ৮.৫৭ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে প্রায় ৫.৭৮ শতাংশ বা ৪৯৫.২৯ মিলিয়ন ডলার কম। এই ৮.০৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে সরাসরি প্রকল্প ঋণ ছিল ৭.৫২ বিলিয়ন ডলার, উন্নয়ন অনুদান ছিল ৫০৩.৯৫ মিলিয়ন ডলার এবং খাদ্য সাহায্য হিসেবে এসেছিল ৫০ মিলিয়ন ডলার। তবে এর চেয়েও আশঙ্কাজনক খবর হলো—বিদেশি ঋণের মূলধন ও সুদের চড়া কিস্তি মেটানোর পর সরকারের কাছে নিট যে বৈদেশিক অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তার প্রবৃদ্ধি বা স্থিতি এক বছরেই প্রায় ২৪.৮৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

ইআরডি-এর উপাত্ত বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশকে পুরোনো আন্তর্জাতিক ধারের কিস্তি শোধ করতেই বিশাল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা গুণতে হয়েছে। গত এক বছরে মূলধন বাবদ ২.৯৫ বিলিয়ন ডলার এবং সুদের ব্যয় বাবদ ১.৫৪ বিলিয়ন ডলারসহ সর্বমোট ৪.৪৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের কাজে ব্যয় করতে হয়েছে। আগের অর্থবছরের ৪.০৯ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয়ের তুলনায় এবার দেশের খরচ বেড়েছে প্রায় ৯.৯৬ শতাংশ বা ৪০৭.১৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, বছরজুড়ে নতুন যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তার প্রায় ৫৯.৭৭ শতাংশ বা অর্ধেকেরও বেশি অর্থ আবার সুদে-আসলে আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছেই ফেরত চলে গেছে। সব দায় মেটানোর পর নিট বৈদেশিক অর্থ ছাড়ের স্থিতি ৪.০৩ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে মাত্র ৩.০৩ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে।

বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ), যার পরিমাণ ২.০৭ বিলিয়ন ডলার। এই তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি (১.৯১ বিলিয়ন ডলার) এবং রাশিয়া (১.০৫ বিলিয়ন ডলার)। এ ছাড়া জাপান ৭৯৫.৩২ মিলিয়ন ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক বা এআইআইবি ৬৯৩.১৩ মিলিয়ন ডলার, চীন ৫৩২.৮৮ মিলিয়ন ডলার এবং ভারত ২৭৮.৬৬ মিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে। কিন্তু নতুন করে প্রকল্প সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংকের আশ্বাস দিয়েছে এডিবি, যা মোট প্রতিশ্রুতির অর্ধেকেরও বেশি বা ২.৬৯ বিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ৮২০.২৫ মিলিয়ন ডলার, জাপান ৩১৪ মিলিয়ন ডলার, চীন ২৭৯.৯৪ মিলিয়ন ডলার এবং এআইআইবি ২৫০ মিলিয়ন ডলারের আশ্বাস দিয়েছে। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, পর্যালোচনাধীন বছরে ভারত বা রাশিয়া থেকে একটি নতুন ডলারেরও কোনো প্রাথমিক প্রস্তাব বা ঋণের অঙ্গীকার আসেনি।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরটি দেশের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক রূপান্তর ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও দাতারা সাধারণতঃ বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পে অর্থায়নের চুক্তি সই করার আগে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সরকারের দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার সক্ষমতাকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখে। তারা এমন সরকারের সাথে চুক্তিতে যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, যারা কয়েক বছর ধরে মেয়াদে বহাল থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। নতুন প্রতিশ্রুতি টানা কয়েক বছর ধরে অর্থ ছাড়ের তুলনায় কম থাকার ফলে দেশের ডেভেলপমেন্ট পাইপলাইন দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, পাইপলাইন ছোট হয়ে আসলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বাজেটের আকার সংকুচিত করতে হবে, যা সরাসরি নিম্নবিত্ত ও প্রন্তিক মানুষের কর্মসংস্থান এবং বাজারে কাঁচা টাকা আসার প্রবাহকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। এই স্থবিরতা কাটাতে হলে সরকারকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশীয় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব থেকে ব্যয়ের উৎস বাড়াতে হবে। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যদি রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত সাফল্য দেখাতে না পারে, তবে বাধ্য হয়ে সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিশাল অংকের টাকা ধার করতে হবে। আর ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের এই ঋণগ্রহণ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে, বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত করবে এবং চূড়ান্ত বিচারে দেশের সার্বিক বিনিয়োগ, কলকারখানার উৎপাদন, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দেবে।

 

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...