উত্তর আমেরিকার দেশ কানাডায় আইনি অনুমোদন ছাড়া বসবাস, ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক বা অনিয়মিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণে সে দেশ থেকে বিদেশী নাগরিকদের বহিষ্কার করার অভিযান চরম জোরদার করা হয়েছে। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটি থেকে অতি দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এমন অপরাধী ও অনিয়মিত নাগরিকদের বৈশ্বিক তালিকায় শীর্ষ দশটি দেশের কাতারে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের নাম। সংস্থাটির চূড়ান্ত নথিতে বর্তমানে অন্তত ৯৬৮ জন বাংলাদেশি নাগরিককে পর্যায়ক্রমে দেশে ফেরত পাঠাবার আইনি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। বিগত এক দশকের মধ্যে কানাডা সরকার তাদের অভ্যন্তরীণ কঠোর অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে অবৈধ বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর সবচেয়ে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, যার সরাসরি কুপ্রভাব এসে পড়ছে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর।
কানাডার শরণার্থী ও অভিবাসন সংক্রান্ত সংস্থা ইমিগ্রেশন, রিফিউজিস অ্যান্ড সিটিজেনশিপ কানাডার (আইআরসিসি) হালনাগাদ তথ্যমতে, বর্তমানে সেদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা মোট ৪০,৮২৭ জন বিদেশী নাগরিকের মধ্যে ৩৬,৬২২ জনই মূলত রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বা অ্যাসাইলাম প্রত্যাশী। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হওয়া ফিফা বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্ট দেখতে ভিজিটর ভিসায় আসা বহু বিদেশীও পরবর্তী সময়ে শরণার্থী হিসেবে থাকার আবেদন করেছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশিদের নাম রয়েছে। বিগত ২০২০ সালে সর্বমোট ৩০৮ জন বাংলাদেশিকে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের কেবল প্রথম ছয় মাসেই সে দেশ থেকে ফেরত পাঠাতে হয়েছে ২২৭ জন নাগরিককে। বর্তমানে ফেরত পাঠানোর দীর্ঘ তালিকায় ৭,৬৬৯ জন নাগরিক নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ভারত এবং ৬,৫৬১ জন নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেক্সিকো; যার পর যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, নাইজেরিয়া, কলম্বিয়া, পাকিস্তান, ব্রাজিল ও চিলির সাথে যৌথ সারিতে দশম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম।
গবেষক ও অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পতনের পর উন্নত দেশগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনে এক অভূতপূর্ব জটিলতা ও ভণ্ডামি তৈরি হয়েছে। পূর্বে যারা আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়নের অজুহাতে বিভিন্ন দেশে স্থায়ী আবাসন চেয়ে আবেদন করেছিলেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলোর আইনি সত্যতা নতুন করে পুনঃমূল্যায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে, পূর্ববর্তী সরকারের সাথে সম্পৃক্ত থাকা ব্যক্তিরা দেশে ফিরলে বিচারের মুখোমুখি হবেন—এমন অজুহাত দেখিয়ে নতুন করে আশ্রয়প্রার্থনার সুযোগ নিচ্ছেন। মূলত উন্নত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের হাতিয়ার হিসেবে রাজনৈতিক আশ্রয়ের এই অনৈতিক ব্যবহার উন্মোচিত হওয়ার পরই কানাডা সরকার তাদের পূর্বেকার শিথিল বা নমনীয় নীতি বাতিল করে চরম কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
একই ধরনের নীতিগত কড়াকড়ির মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে থাকা বাংলাদেশি শরণার্থীদেরও। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে আশ্রয় প্রার্থনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চতুর্থ বৃহত্তম উৎস দেশ। বিগত বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৩৬,৯০১টি বাংলাদেশি আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে কিছু কম হলেও প্রথম ধাপে এই আবেদনের মাত্র ৩ শতাংশ আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে। এছাড়া ইউরোপীয় সীমান্ত রক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যানুযায়ী, ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক অবৈধ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি প্রবাসীদের নাম তালিকার শীর্ষে উঠে আসছে, যা তাদের জন্য বৈধ উপায়ে ইউরোপ ভ্রমণের দরজাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের মতে, দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে মানব পাচারের শিকার হওয়া বা উন্নত দেশে গিয়ে ভিত্তিহীন অজুহাতে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার প্রবণতা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে। বিগত দিনে রাজনৈতিক মামলা বা নিপীড়নের সত্যতা কিছুটা থাকলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভিত্তিহীন কারণ দেখিয়ে বিদেশে স্থায়ী হতে চাওয়া ব্যক্তির সংখ্যাই বেশি। আন্তর্জাতিক দরবারে একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা ধরে রাখা এবং সাধারণ প্রবাসীদের জন্য বৈধ ভিসার পথ সুগম রাখতে হলে এই অনিয়মিত অভিবাসন রোধ করা এবং অসত্য তথ্যে আশ্রয় পাওয়ার প্রবণতা বন্ধে প্রবাসীদের সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।