দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বিদ্যমান টানাপোড়েন দূর করে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে ভারত সরকার। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে যোগ দিচ্ছেন না—এমন সিদ্ধান্তের বার্তা পাওয়ার পরপরই ভারতের পক্ষ থেকে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের এক বিশেষ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরটি যেন কোনোভাবেই অনিশ্চয়তায় না পড়ে, সেজন্য সর্বোচ্চ স্তরে প্রস্তুতি ও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে সাউথ ব্লক। গত পাঁচ মাস আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণকে কার্যকর রূপ দিতে ভারতীয় কূটনীতিতে এখন দৃশ্যমান তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ইঙ্গিত অনুযায়ী, এই সফরে এসে ঢাকাকে যাতে কোনোভাবেই খালি হাতে ফিরতে না হয়, সেজন্য দিল্লির পক্ষ থেকে কিছু ‘অভাবনীয়’ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুবিধার রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ও তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে এক ধরণের অদৃশ্য শীতলতা তৈরি হয়েছিল। এই স্পর্শকাতর ইস্যুটি নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে দৃঢ় ও আপসহীন মনোভাব প্রকাশ করা হলেও নয়াদিল্লি এটিকে অত্যন্ত জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গেই ভারতের প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত মামলা বছরের পর বছর ধরে আইনি মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে। ফলে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আইনি ইস্যুতে দুই প্রতিবেশীর সার্বিক দ্বিপাক্ষিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে স্থবির করে রাখা কোনো পক্ষের জন্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এই বাস্তবতা সামনে রেখে দিল্লি চাইছে মূল বিতর্কিত ইস্যুটিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে কিছুটা সরিয়ে রেখে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও বহুমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নতুন করে আলোকপাত করতে।
দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত সম্প্রতি মিলেছে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভাতেও। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ঢাকার সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নিতে ভারত সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, দুই দেশের চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে সড়ক যোগাযোগ, রেল নেটওয়ার্ক, নদীপথের ট্রানজিট এবং আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের মেয়াদে দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য ও ভিসা কার্যক্রমে যেসব অঘোষিত বিধিনিষেধ ও মন্থরতা নেমে এসেছিল, তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে ব্যবসা-বাণিজ্যকে পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই এখন দিল্লির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী কূটনৈতিক চ্যানেলে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাইকমিশনারের রুদ্ধদ্বার একান্ত বৈঠকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ঢাকার রাজনৈতিক মনোভাব, কূটনৈতিক প্রত্যাশা ও অভ্যন্তরীণ উদ্বেগের বিষয়গুলো সরাসরি অবহিত হতে এই বৈঠকের পরপরই জরুরি ভিত্তিতে দিল্লি ছুটে যান ভারতীয় দূত। সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। ঢাকায় ফিরে এসে তারেক রহমানের দিল্লি সফর দ্রুততম সময়ে চূড়ান্ত করতে তাঁর এই কূটনৈতিক উদ্যোগ এখন চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে।
ভারতের পক্ষ থেকে সময়সূচির দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সাউথ ব্লক ঢাকার কাছে বার্তা পাঠিয়েছে যে, আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই এই দ্বিপাক্ষিক সফরটি অনুষ্ঠিত হওয়া উভয়ের জন্যই সবচেয়ে অনুকূল। কেননা এরপর থেকে বছরের শেষভাগ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, রাষ্ট্রীয় সফর এবং পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে অতিরিক্ত ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। ফলে এই স্বল্প সময়ের মধ্যে সফরটি অনুষ্ঠিত না হলে অদূর ভবিষ্যতে শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এমন সরাসরি ফলপ্রসূ বৈঠকের সুযোগ তৈরি হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী সপ্তাহের দ্বিতীয়ার্ধেই দুই দিনের সরকারি সফরে দিল্লি পৌঁছাতে পারেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।
পরিকল্পিত এই দুই দিনের সফরে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার এজেন্ডা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণ, স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, রেল ও সড়ক ট্রানজিটের আধুনিকায়ন, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা চুক্তি এবং স্পর্শকাতর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা। একই সাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের হুমকি যেন ভূরাজনীতিকে অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে অভিন্ন সমঝোতা গড়ে তোলার চেষ্টা থাকবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রথম ভারত সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণে এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হতে পারে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল সমীকরণে দাঁড়িয়ে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এই সফর দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।