শিরোনামঃ
বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী আমির হামজার গাড়িবহরে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ সংকট: প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে হাসনাতের ৪ প্রস্তাব ইউরোপের বাজারে পোশাক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা: ছয় মাসে আয় কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে ফেরতসহ ৩ শর্তে ভারত সফর করবেন তারেক রহমান ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করা লেবাননের অধিকার: ইরান যেভাবে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে ভারত
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ন

জাতিসংঘের সতর্কতা: দেশে উগ্রবাদের ছায়া?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যমান স্থবিরতার অন্তরালে দক্ষিণ এশিয়া ও সাহেল অঞ্চলে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা ও পর্যবেক্ষণ দলের ৩৮তম প্রতিবেদনে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার আঞ্চলিক শাখা একিউআইএসের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা নিয়ে সুস্পষ্ট উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ভৌগোলিক অবস্থান, পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চরমপন্থী মতাদর্শের অনুসারীরা বাংলাদেশে গোপন সেল বা কাঠামো তৈরির চেষ্টা চালাতে পারে। এই প্রেক্ষাপট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যেমন নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর পুনর্মূল্যায়নকেও অপরিহার্য করে তুলেছে।
জাতিসংঘের অ্যানালিটিক্যাল সাপোর্ট অ্যান্ড স্যাংশনস মনিটরিং টিমের বিশ্লেষণ অনুসারে, বৈশ্বিক স্তরে সন্ত্রাসী হুমকির সামগ্রিক মাত্রা অপরিবর্তিত থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে তা ক্রমান্বয়ে তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার উত্তেজনা, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের তৎপরতা এবং খোরাসানভিত্তিক বিভিন্ন উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কার্যকলাপ পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলকে এক ধরনের অস্থিরতার মধ্যে রেখেছে। এই আঞ্চলিক সংঘাতের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের শেষভাগে দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লায় সংঘটিত আকস্মিক হামলার নেপথ্যে একিউআইএসের সম্পৃক্ততার প্রমাণ আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের ধাক্কা দেয়। একটি আঞ্চলিক গোষ্ঠী যখন প্রচলিত সীমান্ত অতিক্রম করে বড় ধরনের নাশকতার সক্ষমতা প্রদর্শন করে, তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
তবে দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিশেষায়িত সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিটের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে স্থানীয় উগ্রবাদের সরাসরি সাংগঠনিক সংযোগের বিষয়ে সতর্ক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তৎপর বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠন মূলত আন্তর্জাতিক সংগঠনের ভাবাদর্শ অনুসরণ করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, আনসার আল ইসলাম মতাদর্শগতভাবে আল-কায়েদার দর্শনকে গ্রহণ করেছে এবং নব্য জেএমবি আইএসের অনুসারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব গোষ্ঠী মূলত ছোট ছোট গোপন দল বা ‘স্লিপার সেল’ আকারে কার্যক্রম বজায় রাখে, যা সাধারণ সামাজিক কাঠামোর মধ্যে তাদের শনাক্তকরণকে তুলনামূলকভাবে জটিল করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় কিছু অভ্যন্তরীণ ঘটনা গোয়েন্দা নজরদারির কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। গত জুনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটবাজার, গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো জনসমাগমস্থলে আরবি লেখা সংবলিত সাদা পতাকা উত্তোলনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। পুলিশের প্রাথমিক পর্যালোচনায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া এবং অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী এবং মতিঝিল এলাকা থেকে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বিস্ফোরক বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকের রাসায়নিক গঠন ও নির্মাণশৈলীর মধ্যে দৃশ্যমান মিল থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারণা করছে, কোনো একটি নিষিদ্ধ নেটওয়ার্ক সমন্বিতভাবে সক্রিয় হওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তথ্যে আরও একটি বড় বাস্তব সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে চরমপন্থী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পূর্বে আটক হওয়া তিন শতাধিক ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া উগ্রবাদী বন্দীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তি এখনও গ্রেপ্তার এড়িয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এই পলাতক ও জামিনপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পুনরায় কোনো অপ্রচলিত নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে তল্লাশি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক চরমপন্থা আর একক বা দৃশ্যমান সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বহুলাংশে বিকেন্দ্রীভূত এবং ছোট ছোট স্থানীয় ইউনিটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল বা মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, যখন কোনো চরমপন্থী দল সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তখন তারা অপহরণ, চাঁদা আদায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা এবং ক্ষুদ্র সেলভিত্তিক নাশকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। একই সাথে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মগুলোতে আধুনিক রাসায়নিক ও জৈব বিষাক্ত উপাদান তৈরির তথ্য প্রচারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা যে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই এক অদৃশ্য ও মারাত্মক হুমকি।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি মূলত একটি প্রতিরোধমূলক সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে। সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের টেকনিক্যাল কমিটির মূল্যায়নগুলো সাধারণত বিশেষজ্ঞ দল কর্তৃক প্রস্তুত করা হয় এবং তা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এ ধরনের পর্যবেক্ষণকে সম্পূর্ণ অবহেলা করার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি অহেতুক ভীতি সৃষ্টি না করে বাস্তবসম্মত কৌশলগত নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো গোয়েন্দা তথ্যের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা, সীমান্ত অঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো এবং আর্থিক লেনদেনে অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যমের অপব্যবহার কঠোরভাবে রোধ করা।
চূড়ান্ত বিচারে, আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ এবং স্থানীয় বাস্তবতার মধ্যে যে দৃশ্যমান পার্থক্য বিদ্যমান, তা দূর করার একমাত্র উপায় হলো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও পেশাদার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা। কোনো উগ্রবাদী ভাবাদর্শ যেন সাধারণ মানুষের ধর্মানুভূতিকে পুঁজি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না পায়, সেজন্য সামাজিক সচেতনতা ও নজরদারি জোরদার করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে যেকোনো সম্ভাব্য নাশকতামূলক অপতৎপরতার শিকড় উপড়ে ফেলাই এখন রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা, টাইমস অব বাংলাদেশ, ওয়েভ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...