বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের কঠোর বাস্তবতায় প্রাচীন পণ্য বিনিময় বা বার্টার ব্যবস্থা আবারও নতুন আঙ্গিকে ফিরে আসছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য, পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং চ্যানেলের নানা সীমাবদ্ধতা এবং তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার সংকট অনেক দেশকে বিকল্প বাণিজ্যিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দুই দেশ ইরান ও পাকিস্তান ডলার লেনদেনকে এড়িয়ে সরাসরি নিজেদের অভ্যন্তরীণ পণ্যের বিনিময়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারের এক সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত দশম যৌথ বাণিজ্য কমিটির বৈঠকে পণ্য বিনিময় প্রথা কার্যকর করার পাশাপাশি একটি সামগ্রিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ চূড়ান্ত করার ব্যাপারে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই অর্থনৈতিক সমঝোতা মূলত দুই প্রতিবেশীর পারস্পরিক প্রয়োজনের এক বাস্তবসম্মত সমন্বয়। একদিকে ইরানের হাতে রয়েছে পর্যাপ্ত জ্বালানি সম্পদ কিন্তু তাদের খাদ্যপণ্যের ঘাটতি রয়েছে, অন্যদিকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগলেও তাদের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন খাত তুলনামূলকভাবে উদ্বৃত্ত। ফলে প্রচলিত ব্যাংকিং মাধ্যমে ডলার ধার বা ব্যয় না করে সরাসরি নিজেদের উদ্বৃত্ত সম্পদ একে অপরের সাথে অদলবদল করাই এখন সবচেয়ে উপযোগী পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাটানি এবং তীব্র জ্বালানি ঘাটতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সমঝোতার আওতায় পাকিস্তান এখন থেকে ইরান থেকে ডলার খরচ না করেই সুলভ মূল্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), পাইপলাইন বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিশোধিত জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ পাবে। এর ফলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ চাপ হ্রাস পাবে এবং স্থানীয় উৎপাদন খাতে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
বিপরীত দিকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় কোণঠাসা হয়ে থাকা ইরানের প্রধান প্রয়োজন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিশ্চিত করা। নতুন এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ চাল, সুস্বাদু আম এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস আমদানি করবে তেহরান। এমনকি তথ্য অনুযায়ী, ইরানের অভ্যন্তরীণ মাংসের মোট চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ একাই পাকিস্তান থেকে এই বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে পূরণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক ও সুইফট বার্তার ওপর মার্কিন কঠোর নজরদারির কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করা যেখানে প্রায় অসম্ভব, সেখানে এই ধরনের ক্যাশলেস পণ্য বিনিময় ইরানের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তায় এক বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।
তবে কেবল আলোচনার টেবিলে চুক্তি বা নীতিগত সমঝোতাই এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের শতভাগ সাফল্য নিশ্চিত করতে পারে না। কাগজের চুক্তিকে মাঠে কার্যকর রূপ দিতে হলে দুই দেশের সীমান্ত অবকাঠামোর আধুনিকায়ন ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে মীরজাভবে ও রিমদান সীমান্ত বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুই হাজার পণ্যবাহী ভারী ট্রাক নির্বিঘ্নে চলাচলের সক্ষমতা তৈরির বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত অঞ্চলের কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দ্রুতগতির কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা চালু এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দূর করা না গেলে পচনশীল কৃষিপণ্য ও জ্বালানি সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপকে শুধু ইসলামাবাদ ও তেহরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গণ্ডিতে দেখলে এর সামগ্রিক তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। বর্তমান বিশ্বে ডলার-কেন্দ্রিক একমুখী আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজস্ব বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে বহুমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এটি তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ভূরাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও মুদ্রা সংকটে আক্রান্ত বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশ এখন নিজস্ব স্থানীয় মুদ্রা, পণ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মের প্রতি ক্রমেই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে।
অবশ্য এই ধরনের একক উদ্যোগের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের বহু বছরের শক্তিশালী আধিপত্য রাতারাতি ধসে পড়বে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। ডলার বিশ্ববাজারে তার প্রভাবশালী অবস্থান বজায় রাখলেও, আঞ্চলিক প্রয়োজন মেটাতে চাল, ফলমূল, এলপিজি ও বিদ্যুতের মতো অপরিহার্য পণ্যের সরাসরি আদান-প্রদান বিশ্ব বাণিজ্যের চিরাচরিত সমীকরণে এক নতুন মাত্রা যোগ করছে। ইরান ও পাকিস্তানের এই বাস্তবসম্মত কৌশল প্রমাণ করে যে, কৌশলগত সদিচ্ছা থাকলে অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাধা অতিক্রম করেও পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।