শিরোনামঃ
বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই : প্রধানমন্ত্রী আমির হামজার গাড়িবহরে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ সংকট: প্রধানমন্ত্রীর ‘চ্যালেঞ্জ’ গ্রহণ করে হাসনাতের ৪ প্রস্তাব ইউরোপের বাজারে পোশাক বাণিজ্যে বড় ধাক্কা: ছয় মাসে আয় কমেছে ১৬ শতাংশের বেশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: মির্জা ফখরুল ও অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় বাংলাদেশের শেখ হাসিনাকে ফেরতসহ ৩ শর্তে ভারত সফর করবেন তারেক রহমান ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করা লেবাননের অধিকার: ইরান যেভাবে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে ভারত
রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪৯ অপরাহ্ন

সংস্কারের ফাইলবন্দি সুপারিশ: বদলায়নি আমলাতন্ত্রের চালচিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাষ্ট্রকাঠামো এবং শাসনব্যবস্থায় যে গভীর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল জনপ্রশাসন। বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা দলীয়করণ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জবাবদিহিতার সংকট এবং সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতা ভেঙে একটি জনবান্ধব ও দক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যাশায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছিল উচ্চপর্যায়ের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে ১৭টি অধ্যায়ে বিভক্ত দুই শতাধিক বাস্তবমুখী সুপারিশ প্রণয়ন করে জমা দিয়েছিল। তবে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এসব প্রস্তাব জমা পড়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার দৃশ্যমান কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পর বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পার হতে চললেও জনপ্রশাসন সংস্কারের পুরো বিষয়টি প্রায় স্থবির ও উপেক্ষিত হয়ে পড়েছে।
কমিশনের সুপারিশমালার মূল লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক আমলের কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটানো। প্রস্তাবনায় জাতীয় স্তরে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে সমজাতীয় মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে পুনর্বিন্যাস, প্রশাসনিক কার্যক্রম গতিশীল করতে দেশকে চারটি প্রদেশে বিভক্ত করা এবং রাজধানীর জন্য একটি পৃথক বিশেষ শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। এছাড়া ডিসি ও ইউএনও পদবির পরিবর্তন, সিভিল সার্ভিসের সার্বিক পুনর্গঠন, দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডি প্রথা চিরতরে বিলোপ, মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে সচিব নিয়োগ, উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার এবং স্বাধীন ন্যায়পাল নিয়োগের মতো মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সুপারিশ বাস্তবায়নের সুবিধার্থে এগুলোকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ধাপে ভাগ করা হয়েছিল, যেখানে জরুরি বিষয়গুলো মাত্র ছয় মাসের মধ্যে কার্যকরের সময়সীমা নির্ধারণ করা ছিল।
কমিশন কর্তৃক পরিচালিত দেশব্যাপী জরিপেও প্রশাসনের প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের গভীর অনাস্থার চিত্র উঠে আসে। জরিপে অংশ নেওয়া নাগরিকদের ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ স্পষ্টভাবে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন এবং শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ অভিমত দিয়েছিলেন যে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো মোটেও জনবান্ধব নয়। কিন্তু বিপুল এই জনমতের প্রতিফলন নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে দেখা যায়নি। ফলে প্রশাসনকে আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত করার যে অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা প্রশাসনিক অনীহা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী প্রশাসনিক জটিলতার শেকড় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনের বিষয়টিকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক তদবির ও হস্তক্ষেপের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা সহজে দূর করা কঠিন। কেবল কর্মকর্তা বদল বা রদবদল করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বে সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ এবং মানসিকতার পরিবর্তন অপরিহার্য। তিনি মনে করেন, ক্ষমতা এককেন্দ্রিক না রেখে চারটি বিভাগের ভিত্তিতে চারটি প্রদেশ গঠন করে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
অন্যদিকে কমিশনের সদস্য ও সাবেক সচিব মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া প্রশাসনের ভেতর থেকেই সংস্কারের দাবি ওঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের কথা আমলাদেরই সরকারের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। এছাড়া বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে নাগরিক সেবাকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে একটি কেন্দ্রীয় ওয়েব পোর্টাল চালু এবং ক্যাডার সার্ভিসে জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতির রূপরেখা দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। এসব মৌলিক রূপান্তর বিলম্বিত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই ব্যাহত হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ সমাজের প্রতিনিধি ও কমিশনের সদস্য মেহেদী হাসানের কণ্ঠেও সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে গভীর হতাশা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণআন্দোলনের মূল প্রেরণাই ছিল ব্যক্তির পরিবর্তে পুরো শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত রূপান্তর। সরকারি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে যে রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাসী হোন না কেন, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁদের শতভাগ নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি সরকারি দপ্তরে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু, নিয়মিত বাধ্যতামূলক গণশুনানি আয়োজন এবং তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি অফিসে ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সচিবালয় পর্যন্ত বিরাজমান অস্থিরতা ও আস্থার সংকট এখনো কাটেনি। সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে এখনো পূর্বের মতোই নানা জটিলতা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। তাই জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি কার্যকর, পেশাদার ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রযন্ত্র গড়ে তুলতে হলে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে দ্রুত ফাইলবন্দি দশা থেকে বের করে দৃশ্যমান প্রয়োগে নিয়ে আসাই এখন সময়ের একমাত্র দাবি।
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


এ জাতীয় আরো খবর...