শিরোনামঃ
সিজদারত অবস্থায় ইমামের মৃত্যু ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকা নৌকা থেকে উদ্ধার ২৯ বাংলাদেশি, ১০ জনের মৃত্যু দিনে ৩০ নতুন প্ল্যাটফর্ম: অনলাইন জুয়ার থাবায় ডিজিটাল অর্থনীতি রূপালী ব্যাংকের ১৯১ কোটি টাকার অনাদায়ি: পাওনা মেটাতে বেক্সিমকোর ২৬ একর জমি নিলামে পাহাড়, সীমান্ত ও সমতল: বহুমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে দেশ সবুজ সনদের আড়ালে ফাঁদ: সীতাকুণ্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যুতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর প্রতিযোগিতা আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে জ্বালানি খাত: নীতিগত গলদ ও অব্যবস্থাপনার চড়া মাশুল সেলেনা গোমেজের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা পেশাদারিত্বের ঘাটতি না অজ্ঞতার মাশুল: ফিফার নিষেধাজ্ঞার জালে দেশের ফুটবল সংবিধান সংশোধন সংসদেই সম্ভব, রাজপথে বলে লাভ নেই : গয়েশ্বর
সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৫৪ অপরাহ্ন

আমদানি নির্ভরতার ফাঁদে জ্বালানি খাত: নীতিগত গলদ ও অব্যবস্থাপনার চড়া মাশুল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৫ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬

দেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট কেবল সাম্প্রতিক সময়ের কোনো ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা বৈরী আবহাওয়াজনিত আকস্মিক বিপর্যয় নয়। বরং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিগত সরকারের সময়কার দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ উৎস অনুসন্ধানে সীমাহীন অনীহা এবং সমন্বয়হীন পরিকল্পনার এক অবধারিত পরিণতি। গত দেড় দশকে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হলেও, সেই কেন্দ্রগুলো সচল রাখার জন্য প্রাথমিক ও সাশ্রয়ী জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত রেখে একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বিপুল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কলকারখানা ও জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একসময় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হলেও ধারাবাহিক অবহেলা ও নতুন কূপ আবিষ্কারের অভাবে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে এখন ১৬৩ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি নেমে এসেছে। পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক নিয়মেই প্রতি বছর হ্রাস পায়, যা পুষিয়ে নিতে নিয়মিত নতুন ভূতাত্ত্বিক অনুসন্ধান অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর অন্ধ নির্ভরতা তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মূল্যের ওঠানামা, জাহাজ ভাড়া এবং ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে এই আমদানি ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়েছে। মাত্র দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ করায় একটিতে অগ্নিকাণ্ড বা সামান্য কারিগরি সমস্যা দেখা দিলেই পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা দৃশ্যমান হয়েছে বঙ্গোপসাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে। ২০১২ ও ২০১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে ঐতিহাসিক সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিশাল সামুদ্রিক জলসীমায় সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও গত এক যুগেও ব্লুপথে উল্লেখযোগ্য কোনো অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানো হয়নি। যেখানে প্রতিবেশী মিয়ানমার তাদের সীমান্তবর্তী ব্লক থেকে দ্রুত বাণিজ্যিক উত্তোলন শুরু করে লাভবান হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান ও চুক্তি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সমুদ্রের অপার সম্ভাবনা এখনও কেবল সম্ভাবনার পর্যায়েই আটকে আছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ আইন ও দ্রুত অনুমোদনের মাধ্যমে জবাবদিহিহীনভাবে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোতে দেশীয় স্বার্থের চেয়ে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সুবিধা বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত না করে আমদানি করা তেল ও এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নকশা করার পেছনে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে পুরো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অর্থনৈতিকভাবে চরম দেনায় নিমজ্জিত হয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি পোশাক, বস্ত্রকল, সিরামিক, ইস্পাত ও সার কারখানার মতো প্রধান রপ্তানিমুখী ও ভারী শিল্পগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিচ্ছে।
এই অন্তহীন সংকট থেকে উত্তরণে খণ্ডিত পদক্ষেপের বদলে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি করে পুরোনো কূপগুলো সংস্কার এবং স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। একই সাথে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে বঙ্গোপসাগরে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। সর্বোপরি, আমদানি করা ব্যয়বহুল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তি ও টেকসই দেশীয় উৎসের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্যপূর্ণ জ্বালানি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...