দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম বৃহৎ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেডের বন্ধক রাখা বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রির চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কাছে পুঞ্জীভূত বিপুল অংকের পাওনা আদায়ের লক্ষ্যেই এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। বিজ্ঞাপিত তথ্যানুযায়ী, প্রায় ১৯১ কোটি টাকার অনাদায়ি আসল পাওনা এবং আনুষঙ্গিক খরচ সমন্বয়ের জন্য গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন কৌশলগত মৌজায় অবস্থিত প্রায় ২৬ একর জমি ও অবকাঠামো ‘যে অবস্থায় আছে, সেই অবস্থায়’ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে রূপালী ব্যাংকে বেক্সিমকোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪৮২ কোটি টাকারও বেশি। কোম্পানিটি দেশের প্রধান শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলেও সম্পদ নিলামে তোলার এই সংবেদনশীল তথ্য ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বেক্সিমকোর সাবেক দুটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা এবং বেক্সিমকো নিটিংয়ের অনুকূলে গৃহীত ঋণ পরবর্তীতে একীভূত হয়ে বেক্সিমকো টেক্সটাইলে রূপ নেয় এবং সর্বশেষ তা মূল প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো লিমিটেডের আর্থিক স্থিতিপত্রে যুক্ত হয়। ২০২৪ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট দেনার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণের একটি বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। রূপালী ব্যাংকের জারি করা সর্বশেষ নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জের তারাব ও যাত্রামুরা মৌজার ১৭ দশমিক ৪১ একর মূল্যবান জমি এবং গাজীপুরের জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া ও সরাবো মৌজার ৮ দশমিক ৫৫ একরসহ সর্বমোট ২৫ দশমিক ৯৬ একর জমির সুনির্দিষ্ট তফসিল উল্লেখ করা হয়েছে। আগ্রহী দরপত্রদাতাদের জন্য জামানতের হার নির্ধারণ করে আগামী ১৪ সেপ্টেম্বর দরপত্র জমা ও মূল্যায়নের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের স্বার্থে ব্যাংক এই নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও বাস্তবে এসব জটিল সম্পত্তির প্রকৃত ক্রেতা পাওয়া অত্যন্ত দুরূহ। অতীতে বিভিন্ন বিতর্কিত বড় শিল্পগ্রুপের স্থাবর সম্পত্তি নিলামে তুলে ক্রেতা না পাওয়ার একাধিক নজির রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ সালে তৎকালীন বিতর্কিত জিএমজি এয়ারলাইন্সের বিপুল দেনার বিপরীতে সোনালী ব্যাংক কর্তৃক সালমান এফ রহমানের ধানমন্ডির বিলাসবহুল বাসভবন নিলামে তোলা হলেও কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিগত সরকারের সময়ে বেক্সিমকো টেক্সটাইল বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যাংকিং দেনার জটিলতায় তা কার্যকর করা যায়নি। ফলে বর্তমান নিলামটিও শেষ পর্যন্ত একটি আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষের দাবি, বিগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কারখানা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা কৃত্রিম তারল্য সংকটে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন বন্ধ থাকায় তাদের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং কারখানার যন্ত্রপাতি স্থবির পড়ে রয়েছে। ব্যবসা পরিচালনা ও আয়ের পথ রুদ্ধ থাকায় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক চিত্র বলছে, বিগত সরকারের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুকুক বন্ড, জিরো কুপন বন্ড এবং ভুয়া কাগুজে কোম্পানির মাধ্যমে শেয়ারবাজার ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার কারণেই এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হয়েছে। কেবল জনতা ব্যাংকেই গ্রুপটির পুঞ্জীভূত দায়ের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন ব্যাংক মিলিয়ে তাদের মোট দেনা ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বর্তমানে বেক্সিমকো গ্রুপের শীর্ষ কর্ণধার সালমান এফ রহমান কারাবন্দি থাকায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নানামুখী আর্থিক অনিয়ম ও কারসাজির তদন্ত চলমান থাকায় তাদের বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায়ের এই পথ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে ব্যাংকিং মহলে গভীর সংশয় রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই পাওনা উদ্ধারের পদক্ষেপে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়, সেটাই এখন দেখার মূল বিষয়।