শিরোনামঃ
অতিরিক্ত ও সহকারী পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ১৩ কর্মকর্তাকে বদলি জামিনে মুক্তি পেলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক আহতদের চিকিৎসা ও শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : ইশরাক হোসেন চলতি মাসের শেষ দিকে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’: প্রতিমন্ত্রী শ্রম সহযোগিতা নি‌য়ে কাতারের মন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক পর্যটন খাতে সহযোগিতা জোরদারে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার বৈঠক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালট ‘ওপেন’, কে কাকে ভোট দেবেন সবই দেখা যাবে গণমাধ্যম বাংলাদেশে এখন সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছে : তথ্যমন্ত্রী কলকাতায় হোটেলে আগুনে নিহতদের মধ্যে ৫ জন বাংলাদেশি ডপলার রিসার্চের জরিপ: প্রধানমন্ত্রীর কাজে সন্তুষ্ট ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ
বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৪১ অপরাহ্ন

চুক্তির জালে অবরুদ্ধ পদোন্নতি: শীর্ষ প্রশাসনে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

একটি স্বাধীন, গতিশীল এবং জনবান্ধব প্রশাসনিক কাঠামোর স্বপ্ন দেখতে দেখতে বাংলাদেশ পার করেছে দীর্ঘ সময়। বিশেষ করে চব্বিশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ এবং খোদ সরকারি চাকরিজীবীরাও আশা করেছিলেন যে, রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্রে মেধা, সততা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠিত হবে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা দলীয়করণ, অনিয়ম ও পদোন্নতির বৈষম্য দূর করে প্রশাসনকে একটি পেশাদার ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে—এমনটাই ছিল সবার প্রধান প্রত্যাশা। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নতুন সরকার আসার পর গত কয়েক মাসে সচিবালয়ের অন্দরমহলে যা ঘটে চলেছে, তা যেন পুরোনো সেই বৃত্তেরই পুনরাবৃত্তি। শীর্ষ এই প্রশাসনিক পদগুলোতে অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে একের পর এক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি কেবল নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথকেই রুদ্ধ করছে না, বরং পুরো প্রশাসন জুড়ে এক ধরনের গভীর হতাশা, চাপা ক্ষোভ ও স্থবিরতার জন্ম দিচ্ছে।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলার মূল ভিত্তি হলো একটি নির্দিষ্ট রুটিন বা চেইন অব কমান্ড, যার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা। একজন কর্মকর্তা বছরের পর বছর মাঠপর্যায়ে কঠোর পরিশ্রম করে, মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত সচিব বা সচিব পদ পর্যন্ত পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু যখন দেখা যায় যে, এসব গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পদে নিয়মিত ক্যাডার কর্মকর্তাদের বসানোর পরিবর্তে অবসরে যাওয়া সাবেক আমলাদের চুক্তিভিত্তিক এনে বসানো হচ্ছে, তখন নিচের সারির কর্মকর্তাদের সমস্ত পরিশ্রম ম্লান হয়ে যায়। নীতিগতভাবে একটি সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কার্যকর হওয়ার অর্থ হলো অন্তত এক বা দুই বছরের জন্য সেই পদটিতে স্বাভাবিক পদোন্নতির সমস্ত সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ে নিচের সারির অন্তত তিন থেকে চার ব্যাচের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের ওপর। আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে যারা সচিব কিংবা অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার কথা ছিল, তাদের সেই বহুকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন কেবল একটি স্বাক্ষরের কারণে থমকে যায়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালন শেষ হওয়ার পরও একই ব্যক্তিকে বারবার বা নতুন করে বর্ধিত মেয়াদে পুনর্বহাল করার প্রবণতা কর্মকর্তাদের মনের ভেতরে এক ধরনের চরম অনাস্থা তৈরি করছে।
রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর এই ধরনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এক বিশাল অদৃশ্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে চলেছে, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের নজরের আড়ালেই থেকে যায়। বর্তমান প্রশাসনিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে জ্যেষ্ঠ সচিব বা সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক কর্মরত আছেন প্রায় বাইশজন কর্মকর্তা। এর বাইরে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও বারোটি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিতে লোক বসানো হয়েছে। নিয়মানুযায়ী একজন সচিব বা জ্যেষ্ঠ সচিবের মূল বেতনের অঙ্ক পিয়াত্তর থেকে বিরাশি হাজার টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও, এর সঙ্গে যুক্ত হয় সরকারি বাড়িভাড়া, চিকিৎসাসুবিধা, প্রভূত আনুষঙ্গিক ভাতা এবং সার্বক্ষণিক বিলাসবহুল গাড়ির ব্যবহার। সব মিলিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, কেবল একজন চুক্তিভিত্তিক সচিবের পেছনে রাষ্ট্রকে তার নিয়মিত বেতনের বাইরে বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকারও বেশি বাড়তি অর্থ জোগান দিতে হয়।
অন্যদিকে মুদ্রার অন্য পিঠে রয়েছে আরেক বেদনাদায়ক চিত্র, যা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একদিকে অবসরে যাওয়া ব্যক্তিদের উচ্চ বেতনে ও সুবিধায় পুনরায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ফিরিয়ে এনে অতিরিক্ত অর্থের অপচয় করা হচ্ছে, আর অন্যদিকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রায় ৭১৪ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) বা বিভিন্ন দপ্তরে অলস সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। কোনো সুনির্দিষ্ট কার্যভার বা দায়িত্ব ছাড়াই এই বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তাকে কেবল মাসিক বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা দিয়ে বসিয়ে রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা গলে যাচ্ছে। অর্থাৎ, একদিকে দায়িত্বহীন কর্মকর্তাদের বসিয়ে রেখে বেতন প্রদান এবং অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তি দিয়ে ডেকে এনে রাষ্ট্রীয় তহবিল তছরুপ—এই দ্বিমুখী চাপের কারণে আজ জনপ্রশাসনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এক প্রকার খাদের কিনারায় গিয়ে ঠেকেছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঠিক পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, জনপ্রশাসনে বিগত সরকারের রেখে যাওয়া দলীয়করণের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা হবে এবং ‘মেরিটোক্রেসি’ বা মেধার শাসন কায়েম করা হবে। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪৯ ধারার অপব্যবহার রোধ করে মেধার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করার জোরালো প্রতিশ্রুতিও ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার পরিবর্তনের হাওয়া লাগতেই প্রশাসনের পুরোনো চিত্রনাট্য দ্রুত বদলে গেছে। বিগত সরকারের আমলে যারা অতিমাত্রায় সুবিধাভোগী ছিলেন কিংবা যাদের বিরুদ্ধে দলীয়করণের সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল, তাদের হটিয়ে সেই একই চেয়ারে এখন পুনর্বাসিত করা হচ্ছে এমন একদল অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে, যারা বর্তমান ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের অনুগত ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত করতে পেরেছেন। কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে, কাউকে ওএসডি করা হয়েছে, আবার কাউকে চিরতরে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। অথচ মেধার ভিত্তিতে যাদের সচিব হওয়ার কথা ছিল, তারা কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের মারপ্যাঁচে পড়ে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছেন।
আইনি কাঠামোর দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর ৪৯ ধারায় জনস্বার্থে হাঙ্গর বা জরুরি প্রয়োজনে কোনো কর্মচারীকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু এই আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ঠিক কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে, কী ধরনের কারিগরি বা বৈজ্ঞানিক পদে এবং কোন নির্দিষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠিতে এই বিশেষ ধারার প্রয়োগ করা হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালা আজ পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। ফলশ্রুতিতে, প্রতিটি রাজনৈতিক সরকারই নিজেদের পছন্দমতো দলীয় বা অনুগত কর্মকর্তাদের সুবিধা দেওয়ার একটি আইনি ফাঁকফোকর হিসেবে এই ধারাটিকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে আসছে। আশির দশকে যখন প্রথম চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রচলন শুরু হয়েছিল, তখন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিশেষায়িত বা কারিগরি খাতের তীব্র জনবল সংকট মোকাবিলা করা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই সৎ উদ্দেশ্যে তৈরি হওয়া কল্যাণমুখী প্রথাটি আজ আমলাদের রাজনীতিকীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়ংকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের গোড়ার দিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন শীর্ষ পদে একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের যে মহোৎসব শুরু হয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ডকে যেন ম্লান করে দিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চের দিকে যদি আমরা তাকাই, তবে দেখব প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব হিসেবে এ বি এম আবদুস সাত্তারকে চুক্তিভিত্তিক বসানোর মধ্য দিয়ে এই ধারার আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল। এরপর একে একে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর শীর্ষ চেয়ারগুলোতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এক বছরের চুক্তিতে বসিয়ে দেওয়া হলো। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবের মতো রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদের চুক্তিভিত্তিক মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরও তাদের পুনরায় এক বছরের জন্য চুক্তি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক থাকা ১০১ জন কর্মকর্তার চুক্তি বাতিল করে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার যেমন ঠিক একই কায়দায় ৭৯ জনকে চুক্তিতে বসিয়েছিল, বর্তমান সরকারও সেই একই ভুল পথের পুনরাবৃত্তি করছে।
এই লাগাতার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংস্কৃতি কেবল প্রশাসনিক জটই তৈরি করছে না, এটি ভেঙে দিচ্ছে পুরো সিভিল সার্ভিসের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সচিবালয়ের মতো জায়গায় একজন সচিব কেবল দাপ্তরিক ফাইলেই স্বাক্ষর করেন না, তিনি অধীনস্থ শত শত তরুণ ও মেধাবী উপসচিব ও যুগ্মসচিবের মেন্টর বা অভিভাবক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু যখন একজন তরুণ কর্মকর্তা দেখেন যে তার মাথার ওপর বছরের পর বছর একজন চুক্তির আমলা বসে আছেন, যার প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই, তখন সেই তরুণ কর্মকর্তার কাজের স্পৃহা চিরতরে মরে যায়। তিনি বুঝতে পারেন যে যতই সততা ও মেধার স্বাক্ষর রাখা হোক না কেন, উপযুক্ত সময়ে তার কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পাওয়ার কোনো বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। এই চরম হতাশা থেকে আমলাদের একটি বড় অংশ কাজে উদাসীন হয়ে পড়েন এবং আমলাতান্ত্রিক শ্লথতা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তোলে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো নির্দিষ্ট বা ব্যতিক্রমধর্মী কারিগরি প্রকল্প ছাড়া ঢালাওভাবে প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কোনো আধুনিক ও যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে পারে না। সাবেক আমলা ও বুদ্ধিজীবীরাও মত প্রকাশ করেছেন যে, বিগত পনেরো-ষোল বছর ধরে যারা ফ্যাসিবাদের জাঁতাকলে পিষেছেন কিংবা রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হয়ে বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের মধ্য থেকে সৎ ও যোগ্য কিছু কর্মকর্তাকে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার একটি নৈতিক বাধ্যবাধকতা সরকারের থাকতেই পারে। কিন্তু সেই পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি হতে হবে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ এবং সীমিত পরিসরে। পাইকারি হারে বা ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের দরজা খুলে দিলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের নিজের জন্যই বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে। কারণ যে কর্মকর্তারা আজ বঞ্চিত হচ্ছেন, কাল তারাই যখন সরকারের নীতিনির্ধারক হবেন, তখন প্রশাসনিক সংস্কারের পুরো উদ্যোগটিই মুখ থুবড়ে পড়বে।
সরকার পক্ষের নীতিনির্ধারকরা অবশ্য এর জবাবে সবসময়ই যুক্তি দেখান যে, নির্বাচনি ইশতেহার ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য প্রশাসনের ভেতরে তাদের নিজস্ব কিছু বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ হাতের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যে, ঢালাওভাবে নয়, বরং একান্ত প্রয়োজন এবং প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতার খাতিরেই কেবল সীমিতসংখ্যক অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য এই চুক্তির আওতায় আনা হচ্ছে। কিন্তু ভুক্তভোগী নিয়মিত কর্মকর্তাদের প্রশ্ন হলো, যদি প্রশাসন ক্যাডারের লক্ষাধিক কর্মকর্তার মধ্য থেকে উপযুক্ত সচিব খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে সেই ব্যর্থতার দায় কার? দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, মেধার প্রতিযোগিতা এবং মাঠপর্যায়ের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যারা আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন, তাদের যোগ্যতা ও দেশপ্রেমের ওপর যদি সরকারের আস্থার সংকট থাকে, তবে সেই প্রশাসন দিয়ে কীভাবে একটি বৈষম্যহীন ও সুশাসিত রাষ্ট্র গড়ে উঠবে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চিরন্তন সত্য হলো, যেকোনো রাজনৈতিক সরকার আসে এবং যায়, কিন্তু স্থায়ী রাষ্ট্রযন্ত্র বা সিভিল সার্ভিস সবসময় তার নিজস্ব গতিতে দেশের সেবা করে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর খাস কামরার আনুগত্যের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্ব এবং সংবিধানের প্রতি আনুগত্যই একজন আমলার সবচেয়ে বড় ভূষণ হওয়া উচিত। কিন্তু যখন সচিবালয়ের প্রতিটি বারান্দায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের হাওয়া লাগে, তখন পেশাদারিত্বের সেই নরম সুরটি চিরতরে হারিয়ে যায়। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মনে তখন শুরু হয় পদোন্নতি নিশ্চিত করার এক অসুস্থ লবিং এবং তোষামোদির সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির মরণ কামড়ে কেবল মেধাবী কর্মকর্তারাই ঝরে পড়েন না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা।
পরিশেষে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতেই হয় যে, রাষ্ট্র মেরামতের এই মহতি উদ্যোগে জনপ্রশাসনকে যদি সত্যিকারের জনবান্ধব ও দক্ষ করে তুলতে হয়, তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এই অনৈতিক ও বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি থেকে সরকারকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। আইনের ৪৯ ধারাকে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীতান্ত্রিক স্বার্থে ব্যবহার করার পুরোনো অপসংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে। কোনোরকম রাখঢাক না রেখে অতি দ্রুত একটি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত, যেখানে কেবল অত্যন্ত বিশেষায়িত ও কারিগরি পদ ছাড়া সাধারণ প্রশাসনিক সচিবালয়ে কোনো অবস্থাতেই অবসরপ্রাপ্তদের পুনর্বাসনের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে ওএসডি সংস্কৃতির অভিশাপ থেকে প্রশাসনকে মুক্ত করে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সঠিক পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। তরুণ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের মনে আশার আলো জ্বালাতে না পারলে এবং তাদের ক্যারিয়ারের পথ সুগম করতে না পারলে কেবল পুরোনো আমলাদের মুখের খোলস বদলে নতুন মুখ বসিয়ে কোনো দিনই কাঙ্ক্ষিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ করা সম্ভব হবে না।
তথ্যসূত্র: সময়ের আলো


এ জাতীয় আরো খবর...