আবহাওয়ায় তীব্র তাপদাহ না থাকা সত্ত্বেও দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। জ্বালানি গ্যাস সরবরাহের তীব্র ঘাটতির কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে, যার ফলে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এমনকি কোনো কোনো পিক আওয়ারে বা সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে এই ঘাটতি সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সাধারণত লোডশেডিংয়ের মূল ধাক্কাটি দেশের গ্রাম ও মফস্বল এলাকার ওপর দিয়ে গেলেও এবার খোদ রাজধানী ঢাকাতেও তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছেন নাগরিকরা। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে পালা করে চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে এবং একবার গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টার আগে আসছে না। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরও দুর্বিষহ; সেখানে দিনে অন্তত ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় গ্রিডে ১৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১৩ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ ঘাটতি থাকায় দেশজুড়ে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ঢাকার ডেসকো ও ডিপিডিসি এলাকায় চাহিদার তুলনায় ঘাটতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রামগুলোতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এমনকি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর ছুটির দিনেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল।
এই সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের অপ্রতুলতা। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে কেন্দ্রগুলো অলস বসে রয়েছে। সম্প্রতি গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য নির্ধারিত গ্যাসের বরাদ্দ ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং বাকি গ্যাস শিল্প ও সার কারখানায় পাঠানো হচ্ছে। এর ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন নেমে এসেছে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর (আইপিপি) উৎপাদন ২ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করেছে, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, সাগরে থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সচল থাকলেও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা এলএনজি কার্গোগুলো সময়মতো দেশে পৌঁছাতে পারছে না। বাধ্য হয়ে সরকারকে খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে অতি উচ্চমূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। যেখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম পড়ে ৯ থেকে ১০ ডলার, সেখানে স্পট মার্কেটে বর্তমানে প্রতি ইউনিট কিনতে হচ্ছে প্রায় ২৪ ডলার দরে। বিশ্ববাজারের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে গ্যাসে পুরো বছরের ভর্তুকি বরাদ্দ মাত্র দুই মাসেই শেষ হয়ে গেছে, যা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে এক অভূতপূর্ব আর্থিক ও কারিগরি সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।