বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দেশের আর্থিক খাতে যে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির মহোৎসব চলেছিল, তার অন্যতম বড় শিকার হয়েছিল বেসরকারি খাতের বেশ কয়েকটি ব্যাংক। চরম তারল্য সংকট ও অব্যবস্থাপনায় ধুঁকতে থাকা এ রকম পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্প্রতি গঠন করা হয়েছে শতভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’। তবে এই বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল মূলধন ঘাটতি মেটানো এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন হিমশিম খাচ্ছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার মুসলিম বিশ্ব থেকে এই ব্যাংকের জন্য শক্তিশালী ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ বা কৌশলগত অংশীদার খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কাতারের কাছে প্রস্তাব ও সরকারের অবস্থান
ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কাতারকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তাঁর সাম্প্রতিক কাতার সফরকালে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন। এই বিষয়ে গণমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন যে, কাতারের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত কোনো চুক্তি এখনো স্বাক্ষরিত হয়নি। তবে শুধু কাতার নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোকেও পর্যায়ক্রমে এই ব্যাংকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
অর্থ উপদেষ্টা আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, চরম সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আমানতকারীদের জমানো টাকার একটি অংশ কেটে রাখার যে ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি চালুর চিন্তা করা হয়েছিল, তা সরকার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছে। এখন যেকোনো মূল্যে আমানতকারীদের কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। আর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের সামনে মূলত দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থের জোগান দেওয়া, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ ফেলবে। দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে টেকসই উপায়টি হলো বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থাকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যাংকের মালিকানায় যুক্ত করে বড় অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে আসা। মূলত এই দ্বিতীয় বিকল্পটিকে সফল করতেই মুসলিম দেশগুলোর দ্বারস্থ হচ্ছে সরকার।
কৌশলগত অংশীদারের ভূমিকা কী হবে
একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বা কৌশলগত অংশীদার কেবল সাধারণ কোনো শেয়ারহোল্ডার বা নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারী নয়। তাদের ভূমিকা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং সক্রিয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমন অংশীদার যুক্ত হলে তারা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরাসরি কাজ করবে। তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যবসায়ের পরিধি বৃদ্ধি এবং ব্যাংকের পরিচালন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ব্যাংকটির বর্তমানে যে ভঙ্গুর অবস্থা রয়েছে, এর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করতে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনাররা বিপুল অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি তহবিল বা ইক্যুইটি বিনিয়োগ করবে, যা যেকোনো গভীর সংকটের সময়ে ব্যাংকটিকে শক্ত আর্থিক ব্যাকআপ দিয়ে এর স্থায়িত্ব ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের রূপরেখা ও নতুন নির্দেশনা
গ্রাহকদের মনে সবচেয়ে বড় যে উদ্বেগ ছিল, তা নিরসনে গতকাল একটি সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন ডিপার্টমেন্ট। এই নির্দেশনায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের বিস্তারিত রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, যেসব গ্রাহকের ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট (এফডিআর) রয়েছে, তারা চাইলে মেয়াদ পূর্তির আগেই তাদের অ্যাকাউন্টে থাকা পুরো আসল অর্থ একসঙ্গে তুলে নিতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে তারা ব্যাংক থেকে কোনো ধরনের মুনাফা বা লভ্যাংশ পাবেন না। আর কোনো এফডিআর গ্রাহক যদি মুনাফা পেতে চান, তবে তাকে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক রেজল্যুশন স্কিমের আওতায় নিজের আমানত বহাল রাখতে হবে।
অন্যদিকে, যেসব সাধারণ গ্রাহকের কারেন্ট (চলতি) ও সেভিংস (সঞ্চয়ী) অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। তারা তাদের জমানো আসল টাকার পাশাপাশি প্রাপ্য মুনাফাসহ একবারে পুরো অর্থ তুলে নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে অর্থ প্রদান
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যক্তি হিসাবের গ্রাহকদের মূল আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, আজ (১ সেপ্টেম্বর) থেকেই ব্যক্তি হিসাবে স্বাভাবিক লেনদেন পুনরায় শুরু করার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে এবং শাখাগুলোতে অর্থ উত্তোলনের আবেদন গ্রহণ আজ থেকেই শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে গ্রাহকেরা তাদের জমানো সম্পূর্ণ মূল অর্থ এককালীন নগদায়ন করতে পারবেন। তবে শাখা ও উপশাখাগুলোতে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকার প্রয়োজন হবে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নগদ টাকার জোগান নিশ্চিত করা, রিকুইজিশন পাঠানো এবং দেশব্যাপী ঝুঁকিমুক্ত ক্যাশ ব্যবস্থাপনার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আরও কয়েক দিন সময় লাগছে। এই লজিস্টিক প্রস্তুতির জন্যই মূলত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে পুরোদমে অর্থ প্রদান শুরু হবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক চিত্র
এস আলম গ্রুপের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক এবং বিগত সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও ব্যাংক উদ্যোক্তা নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণাধীন এক্সিম ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংক একসময় গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। এই নজিরবিহীন দেউলিয়াত্ব ঠেকাতে এবং গ্রাহকদের বাঁচাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একীভূত হওয়া এই পাঁচ ব্যাংকে প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যক্তি পর্যায়ের ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সঞ্চয়ী হিসাবগুলোতেই রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি হলো ঋণের ক্ষেত্রে। এই ব্যাংকগুলো থেকে মোট ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, যার পাহাড়সম ৮৬ শতাংশই এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা হরিলুটের কারণে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি গিয়ে ঠেকেছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
নতুন ব্যাংকের মূলধন কাঠামো
সব ধরনের দায়বদ্ধতা মাথায় নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে এই মেগা ব্যাংকটি শতভাগ সরকারি মালিকানায় নতুন করে যাত্রা শুরু করে। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল পরিশোধিত মূলধনের মধ্যে সরকার সরাসরি নিজস্ব তহবিল থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে। আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে সাধারণ আমানতকারীদের ব্যাংকের শেয়ার প্রদান করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই কৌশলগত অংশীদার খোঁজার কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা সফল হয় এবং সাধারণ গ্রাহকরা কত দ্রুত তাদের আস্থার জায়গাটি ফিরে পান।