বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২১ পূর্বাহ্ন

নতুন পে-স্কেল: বেতন বাড়ছে, দুর্নীতি কমবে কি?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা ও প্রতীক্ষার পর অবশেষে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে| এই নতুন ও যুগান্তকারী বেতন কাঠামোর ফলে দেশের প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মূল বেতন এক লাফে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে| একই সঙ্গে দেশের প্রায় ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত বা পেনশনভোগীও এই বিশাল আর্থিক সুবিধার আওতাভুক্ত হচ্ছেন| নতুন অনুমোদিত প্রস্তাবনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম গ্রেড থেকে শুরু করে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মরতদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ঠিক ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে| অন্যদিকে, নিম্ন স্তরের অর্থাৎ ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন ১১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি করা হয়েছে| টাকার অঙ্কে হিসাব করলে, ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর সর্বনিম্ন মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত হবে| একইভাবে, প্রথম গ্রেডের বা সচিব পর্যায়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় দাঁড়াবে| বিশাল এই আর্থিক সুবিধা একযোগে না দিয়ে পর্যায়ক্রমে মোট চারটি ধাপে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার| তবে এই নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রতি বছর সরকারের কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে|
বেতন ও ভাতা খাতে সরকারের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের একটি বড় যৌক্তিকতা হিসেবে সরকারি চাকরিতে দুর্নীতি কমার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল| অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১২ জুন রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এমন ইঙ্গিতই দিয়েছিলেন| তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে এবং তাদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত হলে স্বাভাবিকভাবেই দুর্নীতি কমে আসবে| কিন্তু অর্থমন্ত্রীর এই সরল আশাবাদের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা| তাদের মতে, কেবল বেতন বাড়িয়ে কোনো দিনই দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেম, ব্যক্তিগত মানসিকতা এবং কঠোর জবাবদিহির বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত| অতীতেও বহুবার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু দুর্নীতি কমার কোনো ইতিবাচক আলামত কখনো দেখা যায়নি|
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স মনে করেন, সিস্টেমের দুর্বলতার কারণেই মূলত দুর্নীতি ডালপালা মেলে| তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই ঘুণে ধরা সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন না হচ্ছে, ততক্ষণ দুর্নীতি চলতেই থাকবে| তার মতে, দুর্নীতিবাজরা নিচতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত অত্যন্ত সুসমন্বিতভাবে দুর্নীতির ভাগাভাগি করে থাকে এবং সমাজের একটি বড় অংশও এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে| রুহিন হোসেন প্রিন্স আরও একটি ভয়াবহ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন| অতীতে দেখা গেছে, বেতন বাড়লে সরকারি কর্মচারীদের নিজেদের ‘দামি’ বা ‘উচ্চশ্রেণির’ ভাবার প্রবণতা তৈরি হয়, যার ফলে ঘুস বা দুর্নীতির ‘রেট’ বা হার উল্টো আরও বেড়ে যায়| তবে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রশাসনে থাকা সৎ ও ভালো মানুষদের জন্য এই বেতন বৃদ্ধি অবশ্যই একটি স্বস্তির খবর| কিন্তু যাদের মজ্জায় মজ্জায় দুর্নীতি মিশে আছে, এই বিশাল বেতন বৃদ্ধি তাদের মোটেও শোধরাতে পারবে না| এছাড়া তিনি দেশের বিশাল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দেশের মোট কর্মজীবীর প্রায় ৯০ শতাংশই সরকারি কাঠামোর বাইরে কাজ করেন| তাদের জন্য আজও কোনো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা ও বাস্তবায়ন হয়নি, উল্টো অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন| তাই দুর্নীতি কমাতে হলে বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অভিযান পরিচালনা এবং সরকারি কর্মচারীদের কাজের ওপর নিবিড় নজরদারি বাড়ানো অত্যাবশ্যক বলে তিনি মনে করেন|
সরকারি খাতে দুর্নীতি রোধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)| সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দুর্নীতিমুক্ত সেবা পেতে হলে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে বেতনের সামঞ্জস্য থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন| তবে জনগণের কষ্টের করের টাকায় তাদের এই বিশাল বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পেতে হলে অবশ্যই একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া উচিত| আর সেটি হলো, সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে হালনাগাদ করে প্রকাশ করা| টিআইবির প্রস্তাব অনুযায়ী, যারা স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজেদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করবেন, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই এই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়া উচিত| যারা এটি মানবেন না, তাদের এই সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করতে হবে| ডক্টর ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দুর্নীতিবাজদের অবৈধ সম্পদের লোভ এতটাই গগনচুম্বী যে, কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে বেতন বাড়ানো হলে দুর্নীতির মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে| ২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল; বেতন বাড়ার বিপরীতে সেবার মান না বেড়ে উল্টো সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম ও ঘুসের ব্যাপকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল| তাই সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত না করলে এই দুষ্টচক্র থেকে সাধারণ জনগণের কোনোভাবেই পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় নেই|
দুর্নীতির সঙ্গে আর্থিক অনটনের চেয়ে মানসিকতার সম্পর্কই যে অনেক বেশি, তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল| তার মতে, বাংলাদেশে হাজার হাজার কোটি টাকার বড় বড় দুর্নীতি সাধারণত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা সচিবরাই করে থাকেন, সাধারণ পিয়নরা নয়| তাই বেতন বাড়িয়ে এই মজ্জাগত মানসিকতার কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়| তিনি আরও একটি রূঢ় বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, দেশে যদি ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী থাকেন, তবে বেসরকারি খাতে কর্মরত আছেন অন্তত ৩০ লাখ মানুষ| সরকারি খাতে বেতন বাড়ার কারণে বাজারে যে মূল্যস্ফীতি বা জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি তৈরি হবে, তার নির্মম শিকার হবেন এই বিপুল সংখ্যক বেসরকারি চাকরিজীবী| অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া চাপ এবং সরকারি কর্মচারীদের সন্তুষ্ট রাখার রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই বর্তমান সরকার বাধ্য হয়ে এই পে-স্কেল ঘোষণা করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন|
অন্যদিকে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বিষয়টি নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন| তিনি মনে করেন, দুর্নীতি আমাদের নীতি ও জিনগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে| তাই বেতন যতই বাড়ানো হোক না কেন, দুর্নীতি কমার কোনো অলৌকিক সম্ভাবনা নেই| এই দুরারোগ্য ব্যাধি দূর করতে হলে সারা দেশে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন| একই সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি রাখা এবং দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি| লঘু শাস্তির কারণে দুর্নীতিবাজরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে উল্লেখ করে তিনি সরকারের প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণের জোর আহ্বান জানান| পরিশেষে এটি বলাই বাহুল্য যে, বেতন বৃদ্ধি হয়তো সৎ কর্মচারীদের জন্য একটি ন্যায্য প্রাপ্তি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া কেবল টাকার অঙ্ক বাড়িয়ে দুর্নীতির মতো বিষবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটন করা কখনোই সম্ভব নয়|
এই পুনর্লিখিত প্রতিবেদনটি আপনার খবরের ওয়েবসাইটের জন্য কেমন হয়েছে, তা জানাতে পারেন|
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


এ জাতীয় আরো খবর...