প্রতি মাসের শুরুতে ঢাকার লাখ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক যখন তাদের প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করেন, তখন প্রায়ই একটি সাধারণ বিভ্রান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়| রিচার্জের নির্দিষ্ট অঙ্কটি প্রবেশ করানোর সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবহারযোগ্য ব্যালেন্সের ঘরে বেশ বড় একটি অংশের ঘাটতি দেখা যায়| টাকার এই আকস্মিক ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে ডেসকো এবং ডিপিডিসির মতো বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নানা ধরনের সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়| তবে বিলিং প্রক্রিয়ার একেবারে গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এখানে কোনো অদৃশ্য চোর বা জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে না| ডেসকো এবং ডিপিডিসি উভয় সংস্থাই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) অনুমোদন করা অভিন্ন ট্যারিফ বা মূল্যহার কঠোরভাবে মেনে চলে| পুরনো পোস্টপেইড এবং নতুন প্রিপেইড ব্যবস্থার মধ্যে মূল পার্থক্য আসলে বিদ্যুতের দামে নয়, বরং টাকা কাটার সময় এবং পদ্ধতির মধ্যে নিহিত রয়েছে|
এই ডিজিটাল বিলিং প্রক্রিয়ার পেছনের রহস্য উন্মোচন করতে হলে প্রথমে একটি বিদ্যুৎ বিলের তিনটি মৌলিক ভিত্তি বুঝতে হবে| এগুলো হলো—মূল ব্যবহৃত বিদ্যুতের দাম, একটি নির্দিষ্ট মাসিক ডিমান্ড চার্জ বা চাহিদা মাশুল এবং মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট| প্রচলিত পোস্টপেইড ব্যবস্থায় একজন গ্রাহক পুরো মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করার পর মাস শেষে এই পুঞ্জীভূত চার্জগুলো একসঙ্গে পরিশোধ করে থাকেন| কিন্তু প্রিপেইড ব্যবস্থা এই হিসাবের ব্যাকরণটিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে| প্রিপেইড মিটার মূলত ‘আগে দর্শনধারী’ নীতিতে কাজ করে| আপনার ঘরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলো সচল হওয়ার জন্য এক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করার আগেই, মিটারের ভেতরের ডিজিটাল সফটওয়্যারটি সরকারের পাওনা এবং বিতরণকারী সংস্থার নির্দিষ্ট মাশুলগুলো শুরুতেই কেটে নেওয়া নিশ্চিত করে|
গ্রাহকদের মনে সবচেয়ে বেশি রহস্যের জন্ম হয় মূলত নতুন কোনো পঞ্জিকা মাসের একেবারে প্রথম রিচার্জের সময়| একজন গ্রাহক যখন রিচার্জ টোকেনটি মিটারে প্রবেশ করান, তখন সিস্টেমটি মুহূর্তের মধ্যে সক্রিয় হয়ে ওই মাসের জন্য নির্ধারিত মাশুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেয়| উদাহরণস্বরূপ, সংযোগের অনুমোদিত লোডের ওপর ভিত্তি করে একটি ডিমান্ড চার্জ আদায় করা হয়, যা সাধারণ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা নির্ধারণ করা আছে| এর পাশাপাশি, মিটারটি যদি ডেসকো বা ডিপিডিসি সরবরাহ করে থাকে, তবে মাসিক ৪০ টাকা হারে একটি মিটার ভাড়া কেটে নেওয়া হয়| তবে কোনো গ্রাহক যদি খোলাবাজার থেকে নিজের টাকায় পুরোপুরি মিটারটি কিনে থাকেন, তবে এই নির্দিষ্ট ভাড়াটি সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়| এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো গ্রাহক যদি বাড়ি তালাবদ্ধ রেখে টানা এক মাস রিচার্জ করা থেকে বিরত থাকেন, তবে সিস্টেম কিন্তু সেই হিসাব ভুলে যায় না| পরবর্তী মাসে যখনই তিনি নতুন করে রিচার্জ করবেন, তখন বকেয়া মাসের জমে থাকা ডিমান্ড চার্জগুলো একসঙ্গে নির্মমভাবে কেটে নেওয়া হবে বলে ডিপিডিসি সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্পষ্ট করেছে|
হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি বাস্তব উদাহরণ বিশ্লেষণ করা যাক| ধরুন, এক কিলোওয়াট লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক মাসের প্রথম দিনেই ঠিক এক হাজার টাকা রিচার্জ করার সিদ্ধান্ত নিলেন| মিটারের সফটওয়্যার সরাসরি এই টাকা থেকে কোনো ফ্ল্যাট রেট বা গড় হিসাব মাইনাস করে না| প্রথমেই এটি মোট টাকার ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাটের হিসাব করে| এক হাজার টাকাকে ১.০৫ দিয়ে ভাগ করে তার ৫ শতাংশ বের করা হয়, যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৭.৬২ টাকা, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়| এরপর সিস্টেমটি এক কিলোওয়াটের জন্য ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৪০ টাকা মিটার ভাড়া তাৎক্ষণিকভাবে কেটে নেয়| এই কঠোর গাণিতিক হিসাব-নিকাশের পর, ব্যবহারযোগ্য বিদ্যুতের ব্যালেন্স হিসেবে মিটারে জমা হয় ৮৭০.৩৮ টাকা| তবে এখানে সরকারের তরফ থেকে একটি ছোট প্রণোদনাও রয়েছে| আগাম বিল পরিশোধের জন্য প্রিপেইড গ্রাহকরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে একটি সরকারি রিবেট বা ছাড় পেয়ে থাকেন, যা নীরবে তাদের চূড়ান্ত ব্যালেন্সের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়| একই মাসের ভেতরে পরবর্তীতে যতবারই রিচার্জ করা হোক না কেন, তখন আর এই নির্দিষ্ট মাসিক চার্জগুলো কাটা হয় না, তখন কেবল ওই ৫ শতাংশ ভ্যাটই কর্তন করা হয়|
প্রাথমিক এই আর্থিক কর্তনের পর্বটি শেষ হওয়ার পর, বিদ্যুৎ খরচের সঙ্গে সঙ্গে মিটারের ভেতরে শুরু হয় এক নীরব ও অবিরাম স্পন্দন| এখানেই বিইআরসির প্রগতিশীল স্ল্যাব বা ধাপভিত্তিক মূল্যহারের আসল খেলা শুরু হয়| প্রতি নতুন মাসের প্রথম দিনের ঠিক মধ্যরাতে মিটারের সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগের মাসের খরচের হিসাব শূন্যতে নামিয়ে আনে, যার ফলে গ্রাহক একেবারে সবচেয়ে সস্তা ধাপ থেকে নতুন মাসের হিসাব শুরু করার সুযোগ পান| এই ট্যারিফ কাঠামোটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক সুবিধা পান| কোনো পরিবার যদি তাদের পুরো মাসের খরচ ৫০ ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে, তবে তারা ‘লাইফলাইন’ সুবিধা পান এবং তাদের প্রতি ইউনিটের দাম পড়ে মাত্র ৪.৬৩ টাকা| সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথম ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের দাম ধরা হয় ৫.২৬ টাকা| এই সীমা অতিক্রম করলেই বিদ্যুতের দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকে| ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের জন্য প্রতি ইউনিটে গুনতে হয় ৮.৫০ টাকা| এরপরের ধাপগুলো আরও বেশি ব্যয়বহুল: ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত ৯.১০ টাকা, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ৯.৬২ টাকা এবং ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ১৫.০১ টাকা| আর ব্যবহার যদি ৬০০ ইউনিট ছাড়িয়ে যায়, তবে শাস্তিস্বরূপ সর্বোচ্চ ধাপে প্রতি ইউনিটের দাম গিয়ে দাঁড়ায় ১৭.৩৫ টাকায়|
এই স্ল্যাবগুলো কীভাবে একটি মাসিক বাজেটকে বিভক্ত করে, তা বুঝতে আমরা ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারী একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের কথা চিন্তা করতে পারি| বিলিং সফটওয়্যার মোট ব্যবহারের ওপর কোনো গড় দাম বসায় না, বরং বিইআরসির ধাপ অনুযায়ী এটি খরচকে খণ্ডিত করে| প্রথম ৭৫ ইউনিটের হিসাব করা হয় ৫.২৬ টাকা বেসলাইনে, যার দাম আসে ৩৯৪.৫০ টাকা| বাকি ১২৫ ইউনিট চলে যায় পরবর্তী ৮.৫০ টাকার দামি ধাপে, যার ফলে খরচ যোগ হয় আরও ১,০৬২.৫০ টাকা| এতে শুধুমাত্র বিদ্যুতের দাম দাঁড়ায় ১,৪৫৭ টাকা| এর সঙ্গে বাধ্যতামূলক ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ যোগ করলে মোট অঙ্ক হয় ১,৪৯৯ টাকা| সর্বশেষ এর সঙ্গে ৫ শতাংশ হারে ৭৪.৯৫ টাকা ভ্যাট যুক্ত হয়ে ওই ২০০ ইউনিটের জন্য একজন গ্রাহকের চূড়ান্ত বিল দাঁড়ায় ১,৫৭৩.৯৫ টাকা| প্রচলিত পোস্টপেইড ব্যবস্থাতেও এই হিসাবটি প্রায় হুবহু একই রকম হতো, হয়তো সেখানে মিটার ভাড়া ১০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে সামান্য ওঠানামা করত|
পরিশেষে বলা যায়, পোস্টপেইড থেকে প্রিপেইড মিটারে এই রূপান্তরটি মূলত কোনো লুকানো উপায়ে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল নয়, বরং এটি আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির একটি আধুনিক পদক্ষেপ| গ্রাহকদের মনস্তাত্ত্বিক ভীতির মূল কারণ হলো মাস শেষে একত্রে বিল দেওয়ার বদলে শুরুতেই টাকাটা কেটে নেওয়া| এই হিসাব প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা আনতে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন উন্নত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে| গ্রাহকরা চাইলেই ডেসকোর প্রিপেইড কাস্টমার পোর্টালের মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স এবং প্রতিটি পয়সা কাটার নিখুঁত হিসাব যাচাই করতে পারেন| এরপরও স্ল্যাব এবং অগ্রিম চার্জের এই ডিজিটাল গোলকধাঁধায় পড়ে যদি কোনো গ্রাহক বিভ্রান্ত বোধ করেন, তবে তাদের অভিযোগ বা জিজ্ঞাসার দ্রুত সমাধানের জন্য ডেসকোর হেল্পলাইন ১৬১২০ এবং ডিপিডিসির হেল্পলাইন ১৬১১৬ সার্বক্ষণিকভাবে চালু রয়েছে| জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের এই যুগে সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে হলে আধুনিক নগরবাসীর জন্য মিটারের ভেতরের এই অদৃশ্য হিসাবের খাতাটি বুঝে নেওয়া এখন আর কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে|