১) লক ঠিকমতো হয়েছে তো?
আমরা বন্ধুরা মাঝে মাঝে এদিক-সেদিক বেড়াতে যাই। এর মধ্যে একজন আছে সে গাড়িতে উঠে লাফ দিয়ে আবার নেমে যায়। বলে, ‘ঘরের দরজা ঠিকমতো লক হয়েছে কি না দেখে আসি।’ তার স্ত্রী খুব বিরক্ত হয়ে বলে, ‘অন্তত দশবার চেক করেছ। আবার!’
বন্ধুটি তখন লক চেক করার জন্য দৌড় দিয়েছে। বউয়ের কথা শোনার সময় নেই।
২) হাইপারভিজিল্যান্স-
ঘরের দরজা ঠিকভাবে লক হয়েছে কি না এটা নিয়ে আমার বন্ধুটির অতি সতর্কতা সম্ভবত হাইপারভিজিল্যান্সের কারণে সৃষ্ট।
আরেকটু বুঝিয়ে বলি-
হাইপারভিজিল্যান্স হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যখন মানুষ সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকে। এটি কোনো মানসিক রোগ নয়, বরং একটি উপসর্গ।
৩) কেন হয়?
বিভিন্ন কারণে হাইপারভিজিল্যান্স তৈরি হতে পারে-
ক। শৈশবের অনিরাপদ পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী ভয় তৈরি করে।
খ। অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও অতিরিক্ত ভয় তৈরি করে।
গ। অনিরাপদ সম্পর্কও এ সমস্যা তৈরি করে। যেমন, বাবা কখন রেগে যাবেন তার ঠিক না থাকলে শিশু তাঁকে দেখলেই ভয় পায়।
ঘ। মানসিক সমস্যা, যেমন, Anxiety Disorder থাকলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৪) এটি কি সমস্যা?
স্বাভাবিক সতর্কতা সমস্যা নয়- তা আমাদের নিরাপদ রাখে। কিন্তু হাইপারভিজিল্যান্স বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেমন-
ক। অতিরিক্ত উদ্বেগ ও ভয় তৈরি হয়। সারাক্ষণ মনে হতে পারে, বিপদ হতে যাচ্ছে।
খ। ঘুমের সমস্যা হয়। একটু পর পর অজানা আতঙ্কে ঘুম ভেঙে যায়। প্রতি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি বাসায় চোর বা ডাকাত হামলা করল।
গ। সঙ্গীর স্বাভাবিক আচরণেরও নেতিবাচক ব্যাখ্যা তৈরি করে অকারণে সন্দেহ হতে পারে।
ঘ। মস্তিষ্ক সারাক্ষণ সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হতে পারে।
৫) কীভাবে সমাধান করা যায়?
কিছু সহজ নিয়ম অনুসরণ করলে এ সমস্যা সামলানো যায়। যেমন-
ক। ট্রিগার চিনুন। কোন পরিস্থিতিতে আপনি হাইপারভিজিল্যান্ট হয়ে যান চিহ্নিত করুন। তারপর তাতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো বন্ধ করুন। এ রকম কয়েকবার করলে ভয়টা ধীরে ধীরে কেটে যেতে পারে।
খ। অনুমানভিত্তিক সন্দেহ করা বাদ দিন। সত্য আর আন্দাজের পার্থক্য বুঝুন।
গ। শরীরকে শান্ত রাখুন। ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়া, নিয়মিত হাঁটা, মেডিটেশন হাইপারভিজিল্যান্স কমাতে সাহায্য করে।
ঘ। অতীতের কোনো ঘটনার কারণে ভয় পেলে বর্তমানে মন ফেরান। ভাবুন, সেদিন আর নেই- এখন সে বিপদ ঘটার কোনো কারণ নেই।
ঙ। ভয়ের কারণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো বন্ধ করুন।
চ। প্রয়োজনে সাইকোলজিস্টের সাহায্য নিন। (আমি তা নই)
৬) তোরা সব ভূত হয়ে গেছিস!
কিশোরবেলায় আমরা কয়েকজন বন্ধু একবার চট্টগ্রামের বাটালি হিলের উপরে উঠেছিলাম। গল্প করতে করতে সন্ধ্যা নেমে এলো। এবার ফেরার পালা। হঠাৎ খোকন বলল, ‘তোরা সবাই আলাদা আলাদাভাবে সুরা ফাতিহা পড়। নইলে আমি তোদের সাথে পাহাড় থেকে নামব না।’
আমরা তো অবাক! জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুরা পড়তে হবে কেন?’
খোকন খুব জেদি কণ্ঠে বলল, ‘নিচে নেমে বলব, আগে সুরা পড়, নইলে আমি নামব না। জোরে জোরে পড়, যাতে আমি শুনতে পাই।’
অগত্যা কী আর করা! আমরা সবাই জোরে জোরে সুরা ফাতিহা পড়লাম।
খোকন সন্তুষ্ট হলো। পাহাড় থেকে নেমে আমরা তাকে চেপে ধরলাম, ‘আমাদের সুরা ফাতিহা পড়ালি কেন?’
খোকন উত্তর দিলো, ‘এ জায়গায় নাকি ভূত থাকে। তাই সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে মনে হলো, তোরা সবাই ভূত হয়ে গেছিস। সেজন্য তোদের সুরা পড়তে বলেছি। শুনেছি, ভূতরা সুরা পড়তে পারে না।’
আমরা ভিরমি খেলাম!
খোকনের এ ভয় হাইপারভিজিল্যান্স নয়- ভূতের গল্প বেশি পড়ার ফল। সে বয়সে তা ঠিক আছে। কিন্তু বয়সকালে ক্ষণে ক্ষণে ভূতের ভয় পেলে তো অনেক সমস্যা। তাই হাইপারভিজিল্যান্সের সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন।
আমাদের জীবন ভয়মুক্ত হোক। সবার কণ্ঠে সুর উঠুক-
‘আর নহে, আর নয়,
আমি করি নে আর ভয়।
আমার ঘুচল কাঁদন,
ফলল সাধন, হল বাঁধন ক্ষয়।’
⸻
#আসুন মায়া ছড়াই