ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের মধ্যে তেহরানকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধও আরও তীব্র করার অঙ্গীকার করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পুতিন।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কাজ করতেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলে জানান।
পুতিন বলেন, ‘আমরা যাঁদের ভালোভাবে চিনি এবং সাধারণভাবে যাঁদের ওপর আস্থা রাখি, তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ’
ওই দুই বিশেষ দূতের ওপর ট্রাম্পের আস্থা রয়েছে উল্লেখ করে পুতিন বলেন, তাঁরা সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মানুষ।
এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ মস্কো সফর করেন। রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আলোচনা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
র্যাটক্লিফের মস্কো সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে পুতিন বলেন, স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়েও দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তবে বর্তমানে এ ধরনের যোগাযোগ কিছুটা স্থগিত রয়েছে বলে জানান তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিনের বক্তব্য
বিশকেকে পুতিনের বক্তব্যের সময় ইউক্রেন যুদ্ধ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আকাশপথে হামলা বাড়িয়েছে। এসব হামলার অনেক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নেই।
গত কয়েক মাসে ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগার, জাহাজ ও ই-কমার্সের গুদামে দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার কারণে রাশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় পেট্রলের সংকট তৈরি হয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়েছে।
পুতিনের দাবি, ইউক্রেনের হামলায় ৪০ দিনে রাশিয়ার প্রায় ১০০টি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে রাশিয়ার যে ক্ষতি হয়েছে, তা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশের সমান।
ইউক্রেনের হামলার জবাবে রাশিয়াও হামলা বাড়িয়েছে। নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন দিয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাচ্ছে রুশ বাহিনী। রাজধানী কিয়েভেও হামলা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, যার ফলে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি হুমকির মুখে পড়েছে।
পুতিন বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রুশ বাহিনীকে। তাঁর দাবি, এসব হামলার কারণে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশটি আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ইউক্রেনের ড্রোন হামলার কারণে রাশিয়ায় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপদ থাকবে না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুতিন এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ বলে অভিহিত করেন।
পুতিন বলেন, ‘আমি এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে তারাই আমাদের সঙ্গে আবার আলোচনা শুরু করতে চাইছে, ব্যক্তিগত বৈঠকের অনুরোধ করছে। ’ এরপর তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আলোচনা হয় না। ’
এদিকে চলতি মাসের শেষ দিকে রাশিয়ায় পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন শেষে নতুন করে সেনা নিয়োগ বা বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের আশঙ্কা নিয়ে দেশটিতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে পুতিন এমন আশঙ্কাকে ‘আজেবাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা
এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন পুতিন। সেখানে ইরানের জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দেশটির জনগণের ‘সাহস ও দৃঢ়তার’ প্রতি রাশিয়ার সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই রাশিয়া তেহরানের পাশে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্যও ইরানকে দিয়েছে মস্কো। এ ছাড়া ক্যাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানে ড্রোন তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছে রাশিয়া।
কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির পর চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও একে অপরের ওপর হামলা শুরু করেছে।
বিশকেকে পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেন, ‘এ কঠিন সময়ে আপনাদের যে সহায়তা প্রয়োজন, তা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা। এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পণ্যও আমরা সরবরাহ করছি। ’
যুদ্ধের পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন দাবি
সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফের মস্কো সফরের সময় ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও গতিপথ নিয়ে একটি হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরা হয় এবং রুশ নেতাদের সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানানো হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে পুতিন দাবি করেন, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য পান। এসব তথ্য মিলিয়ে যুদ্ধের একটি বস্তুনিষ্ঠ চিত্র তাঁর কাছে রয়েছে।
পুতিনের দাবি, আগস্টে ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ২৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে রুশ বাহিনী। তবে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী ইউক্রেনীয় সংগঠন ডিপ স্টেটের তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে রাশিয়া মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে।
‘হাঙরের’ দাঁতভাঙা জবাবের হুঁশিয়ারি
সাংহাই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আগে রাশিয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক বৈঠকে ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার কেন যুদ্ধে জড়ানো প্রয়োজন, তা বোঝাতে মেরুভালুক ও ‘ঘাতক তিমি’র উদাহরণ দেন পুতিন।
বিশকেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সোভিয়েত আমলে পশ্চিমা দেশগুলোকে ‘সাম্রাজ্যবাদের হাঙর’ হিসেবে বর্ণনা করা হতো।
পুতিন বলেন, ‘কেউ যদি খাদ্যশৃঙ্খলে আমাদের নিচে নামিয়ে দিতে চায়, আমাদের গিলে খেতে বা গ্রাস করতে চায়, তাহলে তারা দাঁতভাঙা জবাব পেতে পারে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘আর এসব হাঙরের ক্ষুধা ও দাঁত দ্রুত বাড়লেও রাশিয়া তা করতে প্রস্তুত। ’ সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস