সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন

অভিজাত ফ্ল্যাটে ক্যাসিনো ও ডার্ক সার্ভার: পর্যটক ভিসার আড়ালে বিদেশি মাফিয়াদের রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চীন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলোতে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতির কারণে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী সিন্ডিকেটগুলো তাদের অপারেশনাল হাব বা অপরাধ পরিচালনার মূল কেন্দ্র হিসেবে এখন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বেছে নিয়েছে| এর মধ্যে সাইবার মাফিয়াদের সবচেয়ে পছন্দের এবং নিরাপদ ‘হটজোন’ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ| পর্যটক, শিক্ষার্থী, খেলোয়াড় কিংবা ব্যবসায়ী ভিসার আড়ালে বৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে ভিনদেশি এই অপরাধীরা রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম, পর্যটন শহর কক্সবাজার ও সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর অভিজাত আবাসিক এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গড়ে তুলছে অনলাইন ক্যাসিনো, স্ক্যামিং এবং সাইবার ব্ল্যাকমেলিংয়ের এক বিশাল আন্ডারওয়ার্ল্ড| সম্প্রতি চট্টগ্রাম মহানগরের খুলশী থানাধীন কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি অভিজাত বাড়ি থেকে আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে একসঙ্গে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে এক নতুন ও অদেখা বিপদের মাত্রা উন্মোচন করেছে|
গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ছয়টি দেশের সাইবার স্পেসে সক্রিয় ট্রান্সন্যাশনাল সিন্ডিকেটগুলোর সদস্যরা বাংলাদেশে তাদের জাল বিস্তার করেছে| বাংলাদেশের ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস সেবার ব্যাপক বিস্তার এবং সাইবার ও আর্থিক অপরাধ দমনে প্রাতিষ্ঠানিক ও ফরেনসিক দুর্বলতাকে অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগাচ্ছে এই বিদেশি চক্রগুলো| তাদের অপরাধের ধরন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও অত্যাধুনিক| অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা, আবাসন ব্যবসার নামে ভুয়া বিনিয়োগ ফাঁদ, ব্যাংকের এটিএম বুথে কার্ড ক্লোনিং করে জালিয়াতি, ক্রেডিট কার্ড হ্যাকিং, অপ্রচলিত সিনথেটিক মাদকের কারবার, অবৈধ অস্ত্র পাচার, জাল মুদ্রা তৈরি, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা থেকে শুরু করে মানব পাচার পর্যন্ত প্রতিটি জঘন্য অপরাধের সাথে এখন বিদেশি নাগরিকদের নাম জড়িয়ে পড়ছে| এছাড়া ক্লোন ওয়েবসাইট বানিয়ে প্রতারণা, নকল মোবাইল ফোন তৈরি এবং সোনা চোরাচালানের মতো অপরাধেও বিদেশিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাচ্ছে পুলিশ|
প্রযুক্তির অন্ধকার দিক ব্যবহার করে এই চক্রগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে| তাদের প্রতারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ‘বিজনেস ইমেইল কম্প্রোমাইজ’ বা ব্যবসায়িক ইমেইল হ্যাক করা| এই পদ্ধতিতে তারা মূলত তৈরি পোশাক খাতের মাঝারি ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার এবং চট্টগ্রামভিত্তিক আমদানি-রপ্তানিকারকদের টার্গেট করে থাকে| বিদেশি বায়ার বা ক্রেতা সেজে হুবহু আসল ইমেইলের মতো দেখতে ভুয়া ইমেইল পাঠিয়ে তারা লাখ লাখ ডলারের পেমেন্ট নিজেদের অ্যাকাউন্টে সরিয়ে নিচ্ছে| এছাড়া বেকার তরুণদের বিদেশে আকর্ষণীয় চাকরি ও ভুয়া ওয়ার্ক পারমিটের প্রলোভন দেখিয়ে এবং সাধারণ মানুষকে অ্যাপের মাধ্যমে উচ্চসুদে ঋণ দেওয়ার নামে ব্ল্যাকমেইল করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে| এমনকি নিঃসঙ্গ বয়স্ক ব্যক্তিরাও এই চক্রের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না| চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে টার্গেট করা ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে| নিজেদের ভুয়া আভিজাত্য প্রদর্শন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া ছবি বা ভিডিও কলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ওপর গভীর মানসিক নির্ভরতা তৈরি করে তারা দামি উপহার পাঠানোর নামে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ভুয়া ফি হিসেবে লাখ লাখ টাকা আদায় করছে|
এই সাইবার অপরাধীদের অপারেশনাল পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল ও ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখার মতো করে সাজানো| দেশের অভিজাত এলাকাগুলোতে তারা যেসব অনলাইন ক্যাসিনো ও স্ক্যামিংয়ের সাবস্টেশন গড়ে তুলছে, সেগুলোর মূল সার্ভার বা ওয়েবসাইট হোস্টিং করা হয় রাশিয়া, মাল্টা, সাইপ্রাস এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে| ডার্ক ওয়েব বা নির্দিষ্ট আন্ডারগ্রাউন্ড প্রোভাইডারের কাছ থেকে এরা ‘হোয়াইট-লেবেল’ বা রেডিমেড ক্যাসিনো সফটওয়্যার কিনে নিয়ে স্থানীয়ভাবে পরিচালনা করে| লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা বেনামি সিম এবং স্থানীয় কিছু অসাধু বাংলাদেশি এজেন্ট ব্যবহার করে| প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএসের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে তা সামান্য কমিশনের বিনিময়ে একাধিক অ্যাকাউন্টে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে স্থানান্তর করে অর্থের মূল উৎসকে গোপন করা হয়|
এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে বিদেশিরা দেশের এক অদৃশ্য ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বা ছায়া অর্থনীতিকে ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা| চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিংয়ের বিশাল আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে| প্রতারণার মাধ্যমে এমএফএসে আসা অর্থ এই চক্রগুলো খুব দ্রুত স্থানীয় এজেন্টদের সাহায্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে| তিনি উল্লেখ করেন, দেশে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়া নজরদারি থাকলেও, ভার্চুয়াল মুদ্রা এবং এমএফএসের এই ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিদেশিদের অর্থ পাচারের এক আদর্শ ও নিরাপদ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে এই ছায়া অর্থনীতি|
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে এই বিদেশি চক্রগুলোর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান ও নজরদারি ব্যাপক মাত্রায় বৃদ্ধি করেছে| ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, বিদেশিদের এই প্রতারণার জাল সব সময়ই ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রেপ্তারের হারও বেড়েছে| সাইবার মাধ্যমে যারাই প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধ করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন| তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, বিদেশি সাইবার অপরাধীদের মধ্যে চায়নিজ ও নাইজেরিয়ানদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি| অনেকেই আবার বিদেশে বসে দেশীয় এজেন্টদের দিয়ে এই অপরাধমূলক কাজ পরিচালনা করছে|
বিদেশি নাগরিকদের অপরাধে জড়ানোর বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, অবৈধভাবে অবস্থান, অপরাধে সম্পৃক্ততা কিংবা অপরাধ করে দেশত্যাগের চেষ্টা রোধে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সমন্বয় করে কাজ করছে| অপরাধীর জাতীয়তা বা পরিচয় এখানে বিবেচ্য নয়; অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে দেশের প্রচলিত আইনের আওতায় তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হচ্ছে এবং এই অভিযান অব্যাহত থাকবে|
তবে এই চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে নিত্যনতুন প্রযুক্তির আশ্রয় নিচ্ছে, যা তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরও অনেক সময় ভাবিয়ে তুলছে| কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান এ প্রসঙ্গে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করে জানান, কক্সবাজারে গ্রেপ্তার হওয়া একটি চক্র প্রাথমিক তদন্তে স্বীকার করেছে যে তারা স্থানীয় ইন্টারনেট প্রোভাইডারের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া ও বিভিন্ন কারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণা পরিচালনা করছিল| স্যাটেলাইটভিত্তিক এই ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তারা খুব সহজেই দেশীয় টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম হচ্ছিল| তাদের পাসপোর্ট ইতোমধ্যে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে এবং জব্দ করা আইফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই চক্রের নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি সম্পর্কে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে| সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার শামীম হোসেনও জানিয়েছেন, কয়েকটি দেশের নাগরিক নিয়ে গঠিত চক্র চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় যে প্রতারণার জাল বিছিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে যা বর্তমানে নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে|
এই ব্যাপক অভিযানের ফলে দেশের কারাগারগুলোতে বিদেশি বন্দিদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে| কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে চার শতাধিক বিদেশি বন্দি রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই চায়নিজ, আফ্রিকান ও ভারতীয় নাগরিক| কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, এসব বিদেশি বন্দিদের নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা রাখা হয় এবং যে জেলায় গ্রেপ্তার হয় সেই জেলার কারাগারেই তাদের রাখা হয়| এমনকি তাদের নিজ নিজ দেশের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিল রেখে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয় এবং যাদের আইনজীবী নিয়োগের আর্থিক সক্ষমতা থাকে না, রাষ্ট্রীয় খরচে তাদের সরকারিভাবে আইনজীবীর ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয়|
কিন্তু এতসব আইনি পদক্ষেপ ও নজরদারির পরও একটি বড় শঙ্কার জায়গা রয়েই গেছে| অনেক বিদেশি নাগরিক আইনি ফাঁকফোকর গলে খুব সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসছেন এবং পুনরায় একই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন| ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করে এই চক্রগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা পুরো বিচারিক ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে| মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক মনে করেন, বিদেশিদের এই ক্রমবর্ধমান ও বহুমুখী তৎপরতা প্রতিহত করতে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রযুক্তিগত উন্নতিসাধনের কোনো বিকল্প নেই| একই সঙ্গে বাংলাদেশে অবস্থানকারী অবৈধ বিদেশিদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনি কাঠামোর আওতায় আনতে না পারলে এই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলোর শেকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে না| সাইবার অপরাধের এই নতুন বৈশ্বিক হাব হিসেবে বাংলাদেশের নাম আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্রযন্ত্রকে সমন্বিতভাবে এই ট্রান্সন্যাশনাল মাফিয়াদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে|

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...