সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন

বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নেই পর্যাপ্ত ‘ব্যাকআপ’, ঝুঁকিতে সরবরাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি, যা সাধারণ দৃষ্টিতে এক অভাবনীয় সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে এই বিশাল সক্ষমতার পরিসংখ্যান মূলত এক মরীচিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ক্রমেই এক ভয়াবহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সেই শূন্যস্থান পূরণ করার মতো পর্যাপ্ত এবং কার্যকর কোনো ‘ব্যাকআপ’ বা বিকল্প মজুত ব্যবস্থা জাতীয় গ্রিডে অবশিষ্ট থাকছে না। ফলে একটি একক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকস্মিক পতন মুহূর্তের মধ্যে পুরো দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা এবং ব্যাপক লোডশেডিংয়ের জন্ম দিচ্ছে।
এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বিকল্প সক্ষমতার অভাবের বিষয়টি সম্প্রতি অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহুমুখী জ্বালানি সীমাবদ্ধতার এই যুগে আদানির একটি ইউনিটের আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রমাণ করেছে যে, দেশে স্থাপিত সক্ষমতার পাহাড় থাকলেও সংকটের মুহূর্তে তা কোনো কাজেই আসছে না। কার্যকর ব্যাকআপ না থাকায় বড় কোনো কেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি বা জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ ও নির্মম চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ছে সাধারণ গ্রাহক এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) সংরক্ষিত তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গভীরতা স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। গত ৯ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আদানির ওই কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট থেকে গড়ে প্রতি ঘণ্টায় ১৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছিল। কিন্তু রাত ১২টার দিকে কেন্দ্রটির একটি ইউনিটের বয়লারে মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে উৎপাদন আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ রাতারাতি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং সরবরাহ মাত্র ৭৫৮ মেগাওয়াটে আটকে যায়। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, আদানির কর্তৃপক্ষ মেরামতের জন্য চার থেকে পাঁচ দিন সময় চেয়েছিল এবং ইতিমধ্যে বেশ কয়েক দিন পার হয়ে যাওয়ায় দ্রুতই ইউনিটটি উৎপাদনে ফিরবে বলে তারা আশাবাদী। তবে এই সাময়িক ত্রুটিই দেশের বিদ্যুৎ খাতের কঙ্কালসার চেহারা বের করে এনেছে।
এর আগেও কয়লা সরবরাহের সংকটে আদানির এই কেন্দ্রটির উৎপাদন বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়েছিল। বিশেষ করে গত আগস্ট মাসের শুরুতে বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন কমে যায়। পরবর্তীতে আগস্টের শেষ ভাগে কয়লার সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং রাতের পিক আওয়ারে ১২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছিল কেন্দ্রটি। কিন্তু উৎপাদন বাড়ার পরপরই এই যান্ত্রিক ত্রুটি জাতীয় গ্রিডকে নতুন করে সংকটে ফেলেছে। আদানির ইউনিট বন্ধ থাকার ওই সময়ে দেশে বিদ্যুতের হাহাকার চরম আকার ধারণ করে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার দিকে যখন দেশে বিদ্যুতের সার্বিক চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট, তখন উৎপাদন ও সরবরাহের পরিমাণ ছিল মাত্র ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি গিয়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে এবং ওই দিন প্রতি ঘণ্টায় গড়ে দুই হাজার ৬৫৭ মেগাওয়াটের ভয়াবহ লোডশেডিং করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে শুক্রবার ও শনিবার এই ঘাটতি কিছুটা কমে এলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
বিদ্যুৎ খাতের এই নাজুক পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ‘সক্ষমতার প্রাচুর্য বনাম উৎপাদনের শূন্যতা’। বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট। এই বিশাল সমুদ্রের তুলনায় আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ৬০০ থেকে ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি নিতান্তই নগণ্য হওয়ার কথা ছিল। স্বাভাবিক ও সুস্থ ব্যবস্থাপনার সময়ে দেশের অন্য কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সামান্য বাড়িয়েই এই ঘাটতি চোখের পলকে পূরণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে গ্যাস, কয়লা এবং তরল জ্বালানি—এই তিনটি প্রধান খাতেই মারাত্মক সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে। বিপিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হতাশার সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, গ্যাসের অভাবে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন তলানিতে ঠেকেছে, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যায় ধুঁকছে এবং তরল জ্বালানি বা ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে পিক আওয়ারে এমনিতেই সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালাতে হচ্ছে। ফলে নতুন করে কোনো কেন্দ্র বন্ধ হলে তা সামাল দেওয়ার মতো এক বিন্দু অতিরিক্ত সুযোগ তাদের হাতে নেই।
জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদনের পরিসংখ্যান এই অক্ষমতাকে আরও পরিষ্কার করে তোলে। সক্ষমতা দ্বিগুণের বেশি থাকা সত্ত্বেও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে মাত্র পাঁচ হাজার ১৪৮ মেগাওয়াট, তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দুই হাজার আট মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ১০ মেগাওয়াট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মাত্র ৮২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। এই চরম দুরবস্থার কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বীজ রোপিত হয়। যুদ্ধের উত্তেজনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় চরম ডলার সংকটের মধ্যে বেশি দামে জ্বালানি কেনাও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র দুই হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দৈনিক ১৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের এই বিশাল ঘাটতির কারণে শিল্প-কারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও তীব্র হাহাকার চলছে। দেশের ৫৯টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ২৬টি কেন্দ্র এখন গ্যাসের স্বল্প চাপে ধুঁকছে এবং বেশ কয়েকটি বড় কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। গ্যাসের এই ঘাটতি সামাল দিতে সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর ভরসা করলেও সেখানেও হতাশা সঙ্গী হয়েছে। আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট আট হাজার ৪২৩ মেগাওয়াট স্থাপিত সক্ষমতা থাকলেও সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন মিলছে না। একইভাবে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৫৩টি কেন্দ্র থেকে চার হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে মিলছে মাত্র দুই হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলমের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের চরম দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে। বছরের শুরুতেই সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট বিবেচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও সংকট মোকাবিলার রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংকটের সময় দেখা যায় অনেক কেন্দ্রের বকেয়া বিল পড়ে থাকায় জরুরি মুহূর্তে সেগুলো চালু করা যায় না। আদানির ঘটনা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্বলতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এই ভঙ্গুর পরিকাঠামো থেকে মুক্তি পেতে হলে এখনই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতের দিনগুলোতে জাতীয় গ্রিড আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...