ঝিনাইদহে ১০ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক কসাইখানা উদ্বোধনের পরদিন থেকেই বন্ধ। কসাইদের অনাগ্রহ ও দক্ষ জনবলের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না স্বয়ংক্রিয় স্লটার লাইন। ফলে কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থেকে মরিচা ধরছে। অন্যদিকে কসাইখানা বন্ধ থাকায় শহরের বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই গরু-ছাগল জবাই করছেন মাংস ব্যবসায়ীরা।
ঝিনাইদহ পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় শহরের পবহাটি কলার হাটসংলগ্ন ৪৯ শতক জমিতে কসাইখানাটি নির্মাণ করা হয়। ২০২৩ সালের ১৫ জানুয়ারি এলডিডিপি ও ঝিনাইদহ পৌরসভার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ওই বছরের ৬ আগস্ট নির্মাণকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ আড়াই বছর পর চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি কসাইখানাটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরে চলতি বছরের ১৭ জুন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আনুষ্ঠানিকভাবে কসাইখানাটি উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের পরদিন থেকেই প্রায় ২ হাজার ৫০০ বর্গফুটের স্থাপনাটি বন্ধ রয়েছে।
কসাইখানাটিতে গরু ও ছাগল জবাইয়ের জন্য রয়েছে দুটি পৃথক স্বয়ংক্রিয় স্লটার লাইন। এসব লাইনে প্রতি ঘণ্টায় ১০ থেকে ১২টি গরু এবং ২০টি ছাগল স্বাস্থ্যসম্মতভাবে প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কসাইখানা চালু না হওয়ায় আমদানি করা আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো পড়ে রয়েছে।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় কয়েকটি যন্ত্রে মরিচাও ধরতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে পৌরসভা।
মাংস ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, স্বয়ংক্রিয় মেশিনে চামড়া ছাড়ানোর সময় চামড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত মাংস উঠে যায়। এতে তাদের লোকসান হয়। পাশাপাশি শহরের মূল মাংস বাজার থেকে কসাইখানাটি দূরে হওয়ায় ভোরে পশু নিয়ে সেখানে যেতে চান না অনেকে। জবাইয়ের ফির পরিমাণ নিয়েও রয়েছে আপত্তি।
মাংস ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘পবহাটি এলাকাটি শহরের মূল মাংস বাজার থেকে অনেক দূরে। ভোর ৪টার সময় গরু-ছাগল নিয়ে এত দূরে যাওয়া আমাদের জন্য কষ্টকর। তাই অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তাছাড়া আধুনিক স্লটার হাউসে প্রতি গরু জবাইয়ের ফির পরিমাণও বেশি। বেশি টাকা দিয়ে আমাদের পোষাবে না। ’
তবে মেশিনে মাংস বেশি উঠে যাওয়ার অভিযোগ নাকচ করে পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ‘মাংস বেশি চলে যাচ্ছে, এটা ঠিক নয়। আধুনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে চামড়া ছাড়ানো হচ্ছে। প্রথম দিকে একটু সমস্যা মনে হলেও এটাই আন্তর্জাতিক মানের পদ্ধতি। মূলত ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। পুরো প্রক্রিয়াটি নতুন ও আধুনিক হওয়ায় মাংস ব্যবসায়ী ও কসাইদের অনেক কিছুই অজানা। ’
পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান চান বলেন, আধুনিক মেশিন পরিচালনার জন্য বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটিও করা হয়েছে। কিন্তু দক্ষ টেকনিশিয়ান ও অপারেটরের প্রয়োজন হওয়ায় কসাইখানাটি চালু করা যাচ্ছে না।
পৌরসভার প্রশাসক রথীন্দ্র নাথ রায় বলেন, কসাইখানাটি অত্যন্ত আধুনিক। এটি পরিচালনার জন্য দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন। লোকবল তৈরির চেষ্টা চলছে। বিদ্যুৎ সংযোগ সচল রাখা এবং মেশিনগুলো ভালো রাখতে ন্যূনতম বিদ্যুৎ বিল দিতে হচ্ছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, কসাইখানা বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ সংযোগ সচল রাখতে প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনাটি পড়ে থাকার পাশাপাশি এর রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ বাবদ নিয়মিত ব্যয় হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আতিকুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্যসম্মত মাংস উৎপাদনের জন্য কসাইখানাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি চালু হলে ঝিনাইদহবাসী নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস পাবে।
তবে উদ্বোধনের পরদিন থেকেই কসাইখানাটি বন্ধ থাকায় প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। কবে নাগাদ এটি পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি পৌর কর্তৃপক্ষ।
ফলে একদিকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পশু জবাই অব্যাহত রয়েছে, অন্যদিকে ১০ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক কসাইখানাটি কার্যত তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে।