দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির অন্যতম জনপ্রিয় ও নিরাপদ বিনিয়োগ খাত হিসেবে পরিচিত জাতীয় সঞ্চয়পত্রে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ ফের ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। সদ্যঃসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ দশমিক ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে একটি অভাবনীয় ও বড় ধরনের পুনরুদ্ধার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র খাতে নিট বিক্রির পরিমাণ যেখানে ছয় হাজার ৬৩ কোটি টাকা ঋণাত্মক অবস্থায় তলিয়ে গিয়েছিল, সেখানে সদ্যঃসমাপ্ত অর্থবছর শেষে এই নিট বিক্রির পরিমাণ ইতিবাচক ৪৩৬ দশমিক ০৬ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে অর্থনীতির এই পরিবর্তনের চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নানা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সাধারণ মানুষের কাছে সঞ্চয়পত্র এখনো আস্থার একটি বড় জায়গা শক্তভাবে ধরে রেখেছে।
তবে সঞ্চয়পত্রের সামগ্রিক বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও সরকারের জন্য এখান থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার সুযোগ এবং কোষাগারে নতুন তহবিল জমার পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এর পেছনের মূল কারণ হলো, নতুন সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে সরকার যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করছে, তার প্রায় পুরোটাই আগের বিক্রি হওয়া পুরনো সঞ্চয়পত্রের আসল ও মুনাফা পরিশোধ করতে গিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার দেশব্যাপী মোট ৯২ হাজার ৫১৩ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ বিক্রির বিপরীতে একই সময়ে মেয়াদোত্তীর্ণ পুরনো সঞ্চয়পত্রের আসল টাকা বা মূলধন বাবদ সরকারকে গ্রাহকদের কাছে ফেরত দিতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। ফলে পুরো এক অর্থবছরের বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের কোষাগারে নিট ঋণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে মাত্র ৪৩৬ কোটি টাকা।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাপ্তির মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান বাজেট ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার একটি বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেই লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু বছর শেষে দেখা গেল, সরকার সেই সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ি অর্থবছরে নতুন বিক্রির পাশাপাশি গ্রাহকদের সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা বাবদ সরকারের মোট পরিশোধের পরিমাণও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় সদ্যঃসমাপ্ত অর্থবছরে গ্রাহকদের মোট অর্থ পরিশোধের পরিমাণ ২৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও এই সঞ্চয়পত্র খাতটি ছিল সরকারের অভ্যন্তরীণ বাজেট ঘাটতি মেটানোর সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০-২১ অর্থবছরেও সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ সংগ্রহের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেই পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ আসছে, তার সিংহভাগই পুরনো বিনিয়োগকারীদের মূল টাকা পরিশোধে ব্যয় হওয়ায় সরকার বাধ্য হয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অন্যান্য উৎসের দিকে ঝুঁকছে। সঞ্চয়পত্রের বদলে এখন ব্যাংক খাত এবং সরকারি সিকিউরিটিজ বা ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ওপর সরকারের নির্ভরতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ফুলেফেঁপে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
সাধারণত মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে গ্রাহকদের মূল ও মুনাফা পরিশোধ করার পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, অর্থনীতির পরিভাষায় তাকেই নিট বিক্রি বলা হয়, যা সরাসরি সরকারের কোষাগারে জমা হয়। নিট বিক্রি ইতিবাচক থাকার অর্থ হলো সরকারের তহবিলে নতুন অর্থের আগমন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাস শেষে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে গ্রাহকদের মোট বিনিয়োগ বা সরকারের ঘাড়ে থাকা ঋণের স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৩৩ হাজার ৯৫৩ কোটি টাকা। এই বিশাল ঋণের স্থিতিটি ২০২৫ সালের জুন মাসের শেষ দিকের তুলনায় শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। এত কিছুর পরও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে সঞ্চয়পত্র এখনো একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে টিকে রয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং বিনিয়োগের অঙ্ক অনুযায়ী মুনাফার হার আলাদাভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ, সাধারণ মানুষের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের প্রবল আগ্রহ থাকলেও সরকারের জন্য এটি আর আগের মতো অবারিত ঋণের উৎস নয়, বরং পুরনো বিপুল পরিমাণ দায় পরিশোধের চাপ সামলাতেই সঞ্চয়পত্রের নতুন বিক্রির অর্থের বড় অংশ ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছে।