মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে যেন নতুন করে চরম বিপর্যয়ের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। একসময় যে মাটি তাদের পূর্বপুরুষদের পদচারণায় মুখরিত ছিল, আজ সেই মাটিতেই তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার এক সুপরিকল্পিত নীলশা বাস্তবায়িত হচ্ছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্মম গণহত্যার পর যারা কোনোমতে নিজেদের ভিটেমাটিতে টিকে ছিলেন, এবার তাদের ওপর নেমে এসেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ সংলগ্ন রাখাইন রাজ্যের এক বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে আরাকান আর্মি উত্তর রাখাইনে এক অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একের পর এক রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের আবাদি জমি দখল করে সেখানে গড়ে তুলছে বন্দিশিবির, সামরিক ব্যারাক ও নিজেদের বসতি। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক বিস্তারিত ও রোমহর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত চিত্র, জাতিসংঘের নিবিড় গবেষণা এবং এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফেরা প্রত্যক্ষদর্শীদের লোমহর্ষক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে দ্য গার্ডিয়ান তাদের এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বুথিডং টাউনশিপের হ্নগেট থায় নামক এলাকার একটি সুবিশাল ধানখেতের কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ইতিহাস বলছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ওই বিস্তীর্ণ সবুজ জমিতে স্থানীয় রোহিঙ্গারা অত্যন্ত স্বাধীনভাবে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে, অর্থাৎ ২০২৬ সালে এসে সেই সবুজ প্রান্তরের চিত্র পুরোপুরি পালটে গেছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে এখন সেখানে সারি সারি ১২০টি ধূসর রঙের কংক্রিটের ভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এগুলো আর কিছুই নয়, আরাকান আর্মির সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত নিশ্ছিদ্র বন্দিশিবিরের স্থাপনা। সেখানে রাখাইনের আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা অসংখ্য নিরীহ রোহিঙ্গা পরিবারকে অমানবিক অবস্থায় আটকে রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো রোহিঙ্গারই ওই শিবিরের ভেতরে প্রবেশ করার বা সেখান থেকে বাইরে বের হওয়ার সামান্যতম কোনো সুযোগ নেই।
উত্তর রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার পর থেকে আরাকান আর্মি এ ধরনের অন্তত ১০টি বড় মাপের বন্দিশিবির তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। মিয়ানমার শাসনকারী জান্তাবাহিনী এবং স্থানীয় উগ্রপন্থী বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক বিতাড়ন ও জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে ইতিমধ্যে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থায় যারা রাখাইনে নিজেদের মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন, তাদের ওপর আরাকান আর্মির এই নতুন আগ্রাসন এক চরম অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১৮ বছর বয়সি তরুণ রোহিঙ্গা শরণার্থী মুহাম্মদ আরেস তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আরাকান আর্মি প্রথম যখন তাদের এলাকায় প্রবেশ করে, তখন থেকেই সেখানে তীব্র ও রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়ে যায়। এসব সশস্ত্র সংঘর্ষের সময় ক্রসফায়ারে পড়ে অসংখ্য নিরীহ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারান।
আরেস অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান যে, শেষ পর্যন্ত আরাকান আর্মির সদস্যরা তাদের পুরো গ্রামটি আগুনে পুড়িয়ে আক্ষরিক অর্থেই মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। এরপর তারা সব বাস্তুচ্যুত মানুষকে অস্ত্রের মুখে একত্র করে জোরপূর্বক ট্রাকে তুলে এসব বন্দিশিবিরে নিয়ে যায়। আরেসের ভাষায়, আরাকান আর্মি মূলত তাদের দীর্ঘদিনের মাতৃভূমিকে একটি জোরপূর্বক শ্রমের শিবির এবং সামরিক ঘাঁটির এক বিশাল ও সুসংগঠিত নেটওয়ার্কে পরিণত করেছে।
আরেকটি ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের উদাহরণ হলো ওয়েত নিয়ো তাউং এলাকা, যেখানে মায়ু নদীর তীরঘেঁষে একসময় সারি সারি ছিমছাম রোহিঙ্গা গ্রাম ছিল। বর্তমান বন্দিশিবিরটি সেখান থেকে মাত্র তিন মাইল দূরে অবস্থিত। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ওই এলাকাটি যখন সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সেখানকার সাধারণ রোহিঙ্গা কৃষক ও নৌকার মাঝিরা তাদের সাজানো বাড়িঘর, কৃষিজমি ও বংশপরম্পরায় গড়ে তোলা ফলের বাগান চিরতরে হারান। ২৬ বছর বয়সি রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ সাদিক সেই দুঃসহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীটি গ্রামের সব বড় বড় গাছ এবং বহু বছরের পুরোনো ফলের বাগানগুলো নির্দয়ভাবে কেটে ফেলে এবং পুরো জমিটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দেয়। তারা গ্রামের রাস্তাঘাট ও অন্যান্য ভৌত কাঠামো এমনভাবে মুছে দেয়, যেন সেখানে কোনোদিন মানুষের বসতিই ছিল না। এরপর তারা রোহিঙ্গাদের নিজস্ব আবাদি জমির ওপর নিজেদের জন্য বাড়ি ও সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করে।
নিষ্ঠুরতার মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। বেঁচে যাওয়া একাধিক ব্যক্তি দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন যে, আরাকান আর্মি তাদের নিজেদের বাড়ি নিজেদের হাতেই ভেঙে ফেলতে বাধ্য করেছিল। এরপর সেই ভাঙা বাড়ির মূল্যবান উপকরণ ও কাঠ ব্যবহার করেই বিদ্রোহীদের জন্য নতুন সামরিক স্থাপনা তৈরি করতে তাদের বাধ্য করা হয়। এর মধ্যে ওয়েত নিয়ো তাউং এলাকায় নির্মিত ‘এপি ব্যাটালিয়ন’ নামে পরিচিত একটি সুপরিচিত সামরিক ব্যারাকও রয়েছে। অনেক তরুণ রোহিঙ্গা অভিযোগ করেছেন যে, সেখানে তাদের সম্পূর্ণ জোরপূর্বক এবং ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামরিক কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সাদিক নামের ওই যুবক জানান, আরাকান আর্মি তাদের দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করা, পরিখা খনন করা এবং তাদের সামরিক শিবিরের ভেতরে সীমাহীন কায়িক শ্রম করতে বাধ্য করত। কেউ যদি কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে যেত, তবে তাকে কোনো পানি বা বিশ্রাম না দিয়ে কাঠফাটা রোদের মধ্যে ফেলে রেখে চরম শাস্তি দেওয়া হতো।
জাতিসংঘের একটি অভ্যন্তরীণ ও অত্যন্ত গোপনীয় প্রতিবেদনে এই ধ্বংসযজ্ঞের আরও ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ২৩টি রোহিঙ্গা গ্রামের অন্তত ৮০০ হেক্টর বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ জমি জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। এরপর সেখানে বন্দিশিবির, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য নতুন বসতি অথবা বিশাল আকারের সামরিক অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘের ওই সুনির্দিষ্ট গবেষণায় নির্দিষ্ট ওই সময়সীমার মধ্যে আরাকান আর্মি কর্তৃক রোহিঙ্গাদের জমি দখল বা তাদের নিজ ভিটেমাটি থেকে বাস্তুচ্যুত করার অন্তত ২৯টি বড় ধরনের ঘটনা সুচারুভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এই চরম অস্থিতিশীলতা ও জীবনের ঝুঁকির মুখে ২০২৪ সালের পর থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নতুন করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালের ভয়াবহ সামরিক অভিযানের পর মিয়ানমারে আনুমানিক ৬ লাখ রোহিঙ্গা থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু আরাকান আর্মির এই নতুন আগ্রাসনের কারণে ওই অবশিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশই ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বর্তমানে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অত্যন্ত গাদাগাদি করে বসবাস করছেন, যা বাংলাদেশের ওপর এক বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের একজন শীর্ষ বিশেষজ্ঞ দ্য গার্ডিয়ানকে নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির চূড়ান্ত সমাপ্তি এখানেই ঘটতে যাচ্ছে, এ নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, রোহিঙ্গারা যতদিন এই ভয়ংকর ও অমানবিক পরিস্থিতি সহ্য করতে পারবে, ততদিন তারা এই জেলের মতো বন্দিশিবিরগুলোতে হয়তো বেঁচে থাকতে পারবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাদের আর নিজেদের পুরোনো বাড়ি বা গ্রামে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
দ্য গার্ডিয়ানের নিজস্ব অনুসন্ধানে সংগৃহীত সাক্ষ্য এবং জাতিসংঘের একাধিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে শারীরিক নির্যাতন, জঘন্য যৌন সহিংসতা, নির্বিচারে নিরীহ মানুষ গ্রেপ্তার, জোরপূর্বক শ্রম আদায়, জোর করে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ এবং অবৈধভাবে ‘কর’ বা চাঁদা আদায়ের পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অমানবিক কৌশল এর আগে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবাহিনীও হুবহু ব্যবহার করেছিল। ৩২ বছর বয়সি এক রোহিঙ্গা ব্যক্তি তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, তাকে জোর করে আরাকান আর্মিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং টানা এক মাস অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে তার ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন ও মারধর চালানো হয়। আরেকজন অসহায় পিতা অভিযোগ করেন যে, আরাকান আর্মির সদস্যরা তার ২২ বছর বয়সি তরুণী মেয়েকে জোর করে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাকে সেখানে অকথ্য শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয় এবং পরবর্তীতে বাধ্য করা হয় সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে। হ্নগেট থায় বন্দিশিবিরে বর্তমানে এমন অনেকেই আটকে আছেন, যারা মূলত ২০২৪ সালের ২ মে হোইয়ার সিরিতে সংঘটিত মর্মান্তিক গণহত্যা থেকে কোনোমতে নিজেদের প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছিলেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি নিজস্ব তালিকায় ওই হোইয়ার সিরি গণহত্যায় নিহত বা নিখোঁজ হওয়া ১৭০ জনের বেশি সাধারণ গ্রামবাসীর সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ব্যাপার হলো, এই তালিকার প্রায় ৯০ জনই হলো নিষ্পাপ শিশু। তবে প্রত্যাশিতভাবেই আরাকান আর্মি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তাদের সাফাই হলো, তারা সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর কোনো হামলা চালায়নি, তারা শুধু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং হাতেগোনা কয়েকজন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদেরই লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
মিয়ানমার বিষয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা বা ‘ইন্ডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম ফর মিয়ানমার’ (আইআইএমএম)-এর প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান এই পরিস্থিতির একটি ভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর এসব ধারাবাহিক হামলার পরিকল্পনাকারীদের মূল লক্ষ্যই ছিল মাঠপর্যায়ে একটি স্থায়ী নতুন বাস্তবতা তৈরি করা, যাতে রোহিঙ্গারা আর কখনো তাদের হারানো অধিকার ফিরে না পায়। তবে জাতিসংঘের ওই তদন্ত ব্যবস্থা এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি যে, রোহিঙ্গাদের জমি ও গ্রাম ধ্বংসের জন্য এককভাবে আরাকান আর্মিই দায়ী কি না। কুমজিয়ান বলেন, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, মিয়ানমারের ভেতরে এখনো যেসব রোহিঙ্গা টিকে আছেন, চলমান সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষই এখন তাদের অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের প্রখ্যাত অধ্যাপক টম ড্যানেনবাম এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর এ ধরনের জবরদস্তি এবং তাদের নিজ মাতৃভূমি ও এলাকা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার এই সমন্বিত ও সুপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনে ‘জনসংখ্যা স্থানান্তর’ বা পপুলেশন ট্রান্সফার নামক ভয়ংকর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে মিয়ানমারের নির্বাসিত জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) সম্প্রতি পর্যন্ত একমাত্র রোহিঙ্গা সদস্য অং কিয়াও মো এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মূল বিষয়টি এখন আর এটা নয় যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে কোনোমতে টিকে থাকতে পারবে কি না। বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেখানে এমন কোনো সুকৌশলী পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে কি না, যা রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করার পাশাপাশি তাদের ভৌত, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সব ধরনের উপস্থিতিকে চিরতরে মুছে ফেলার বিষয়টিকে অপরিবর্তনীয় করে তুলবে।
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গত জানুয়ারিতে রোহিঙ্গা গণহত্যার মামলার আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু করেছে। এই সর্বোচ্চ আদালত এর আগেই সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, পরিকল্পিতভাবে কোনো জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা এবং তাদের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস করাকে গণহত্যার একটি অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতনগুলো গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে কি না, সে বিষয়ে চলতি মাসেই আইসিজে একটি ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এই রায়ের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব, তবে রাখাইনে আরাকান আর্মির নতুন এই আগ্রাসন রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার পাওয়ার আশাকে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।