সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন

ধূলিকণার আস্তরণে ঢাকছে সৌরশক্তি: নির্মল জ্বালানির বিকাশে বড় বাধা বিষাক্ত বায়ু

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে দিন দিন বাড়তে থাকা তীব্র বায়ুদূষণ শুধু মানুষের শ্বাসতন্ত্র ও জনস্বাস্থ্যের ওপরই আঘাত হানছে না, বরং পরিবেশবান্ধব টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এক মারাত্মক অদৃশ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাতাসে ভেসে থাকা ক্ষতিকর ধূলিকণা ও বিষাক্ত ধোঁয়া সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর গভীর সংকট তৈরি করছে। প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে যে পুরু ধূলিকণা ও ছাই বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, তা পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়ে সোলোর প্যানেলগুলোর উপরিভাগে। ফলে প্যানেলের ওপর এক ধরনের স্থায়ী ময়লা ও কালচে আস্তরণ তৈরি হয়ে সূর্যের স্বাভাবিক কিরণ প্রবেশের পথ রুদ্ধ হয়ে যায় এবং সার্বিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পায়। পরিবেশ গবেষকদের মতে, এটি এক ধরনের জটিল ও সর্বনাশা দুষ্টচক্রের জন্ম দিয়েছে, যেখানে বায়ুদূষণ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে সৌরশক্তির বিস্তার ঘটানোর চেষ্টা করা হলেও খোদ দূষিত বায়ুই সেই পরিচ্ছন্ন রূপান্তরের পথকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করছে।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ডিআরইউ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘বায়ুদূষণ রোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এখনই’ শীর্ষক এক বিশেষ পরিবেশবিষয়ক আলোচনা সভায় পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা এই উদ্বেগজনক বাস্তবতার বিশদ চিত্র তুলে ধরেন। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় দেশের আরও প্রায় ৩৭টি নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন সক্রিয়ভাবে সংহতি প্রকাশ করে অংশগ্রহণ করে। সভায় উপস্থাপন করা মূল প্রবন্ধে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, একদিকে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা ও ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের জন্য বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে চাইছে। অথচ অন্যদিকে দেশে বিদ্যমান মাত্রাহীন বায়ুদূষণ সেই সবুজ ও পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎপাদন সক্ষমতাকেই গলা টিপে ধরছে।

পরিবেশবিদদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এই দূষণের চক্রাকার অভিঘাতের কারণে একদিকে যেমন বড় বড় সোলার পার্ক ও রুফটপ সোলার প্রকল্পগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি সৌর প্যানেলগুলোর স্থায়িত্ব ও কার্যক্ষমতাও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। বাতাসে ধূলার ঘনত্ব বেশি থাকায় প্যানেলগুলো ঘন ঘন পরিষ্কার করতে প্রচুর অতিরিক্ত জল ও জনবলের প্রয়োজন পড়ছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সার্বিক খরচকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হলো, জাতীয় পরিকল্পনা ও নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বায়ুমণ্ডলের এই নাজুক অবস্থার কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ফলে পরিবেশ রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার নিজেই দূষণের শিকারে পরিণত হয়ে কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শরীফ নাফে এস-সাবের এই বহুমাত্রিক সংকটের শিকড় চিহ্নিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করতে হলে সবার আগে সংকটের মূল চরিত্র ও উৎসগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে হবে। সমস্যাটির প্রকৃতি ও ভয়াবহতা সম্পর্কে সমাজ ও নীতিপর্যায়ে স্পষ্ট সচেতনতা তৈরি না হলে কোনো টেকসই সমাধান কার্যকর করা সম্ভব নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দূষণ প্রতিরোধ ও নবায়নযোগ্য শক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদের দেশীয় বাস্তবতার উপযোগী প্রযুক্তির উন্নয়ন করতে হবে এবং একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে বিদ্যমান উন্নত বিদেশি প্রযুক্তির সঙ্গে তার একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় ঘটাতে হবে। স্থানীয় জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক কৌশলের মেলবন্ধন ঘটিয়েই কেবল দূষণের এই সর্বগ্রাসী চক্র থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব।

বিদ্যমান এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণ এবং দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারকে গতিশীল করতে পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের পক্ষ থেকে সভায় তিনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশ করা হয়। প্রথম সুপারিশ হিসেবে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা সামাল দিতে শিল্প খাতে দ্রুত ৩ হাজার মেগাওয়াট রুফটপ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক প্রত্যাহার করে উদ্যোক্তাদের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানির নীতিগত সুবিধা প্রদানের আহ্বান জানানো হয়, যাতে করে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার আরও সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়।

দ্বিতীয় সুপারিশে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। দূষণের কারণে প্যানেলে জমে যাওয়া ধূলিকণা ও ময়লা দ্রুত অপসারণ করতে প্রচলিত কায়িক পদ্ধতির বদলে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং রোবোটিক ক্লিনিং প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়। রোবট ও আধুনিক সেন্সর ব্যবহারের ফলে কোনো মানবিক ত্রুটি ছাড়াই প্যানেলগুলো সার্বক্ষণিক পরিষ্কার রাখা সম্ভব হবে, যা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। তৃতীয় সুপারিশে শিল্পকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া এবং কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়। যেসব কারখানা বা বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যাপ্ত ফিল্টার ছাড়া বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ছাই নির্গমন করছে, সেগুলোর ওপর কঠোর আইনি প্রয়োগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আলোচনা সভায় অন্যান্য পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদরাও এই জাতীয় সংকট নিয়ে মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এ টি এম নুরুল আমিন এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মাহমুদা পারভীন বায়ুদূষণের সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতার গভীর সম্পর্কের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মো. জিয়াউল হক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী এবং বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম প্রমুখ আলোচনায় অংশ নিয়ে সমন্বিত জাতীয় নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান। তারা উল্লেখ করেন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা ও তেলের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা বজায় রেখে কেবল কিছু সোলার প্যানেল বসিয়ে পরিবেশ রক্ষা করা অসম্ভব।

সার্বিকভাবে এই আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে একটি অত্যন্ত কঠোর ও অকাট্য বার্তা সামনে এসেছে| পরিবেশদূষণকে কেবল একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর, ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা এবং টেকসই অর্থনীতির পথেও এক বড় ধরনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি একদিকে কয়লা ও ভারী জ্বালানির দূষণ কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ না করে এবং অন্যদিকে সৌর প্যানেল সুরক্ষা ও শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ না করে, তবে কোটি কোটি টাকার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ধূলির আস্তরণের নিচে চাপা পড়ে থাকবে। জাতীয় স্বার্থে বায়ু নির্মল রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে এখনই পরিবেশ ও জ্বালানি খাতকে এক অভিন্ন রূপরেখায় নিয়ে এসে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে|

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...