রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন

বলিউডের নায়িকা ও বইমেলা

বাদল সৈয়দ / ১২ বার
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬

১৯৮৬ সাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি।
আমাদের সাথে বলিউডের এক নায়িকাও ভর্তি হয়েছে।
এতই সুন্দরী!
নাম সুরভী।
আমরা তার সামনে নায়কের ভঙ্গিতে হাঁটি। অমিতাভ বচ্চন স্টাইলে সিগারেট ধরাই। দৈনিক আজাদীতে ছাপা হওয়া কবিতা নিয়ে তার সামনে পাতা উল্টাই। যদি জিজ্ঞেস করে— ‘কার কবিতা?’ তখন বুক ফুলিয়ে বলব— ‘আমার।’
আশা পূরণ হয় না। নায়িকা পাত্তাও দেয় না। গমগমিয়ে চলে যায়।
তার সামনে নিজের ইজ্জত বাড়ানোর কী অদম্য চেষ্টা আমাদের!
তারপর একদিন ইজ্জতের বারোটা বাজলো!
আমি আর বাল্যবন্ধু খোকন তখন হুলুস্থুল কবিতা লিখি। দুজনেই বিখ্যাত কবি আবু মুসা চৌধুরীর সাগরেদ হয়েছি। তার পেছন পেছন পুরো চট্টগ্রাম শহর চষে বেড়াই। তাঁকে বিড়ি-সিগারেট এনে দেই। কোথাও চা খেতে বসলে তাঁর চায়ের কাপ আলাদা করে গরম পানিতে ধুয়ে দেই।
কিছুদিন পর ‘একুশ’ উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম মুসলিম হলের খোলা চত্বরে বইমেলার আয়োজন করা হয়েছিল। মুসা ভাই একটি স্টল নিয়েছেন। সারিন্দা হিসেবে নিয়েছেন আমাদের দুজনকে।
সমস্যা হলো তিনি স্টল এবং কিছু বইপত্র জোগাড় করেই খালাস। এরপর তাঁর কোনো দায়িত্ব নাই! স্টল সাজানো, সেটা চালানো এগুলো আমাদের করতে হবে! বেতন-ফেতন তো দূরের কথা— পেটেভাতেও রাখার ব্যবস্থা নেই। অন্নের সংস্থান আমাদের নিজেদেরই করতে হবে।
আমি আমতা আমতা করে বললাম— ‘মুসা ভাই, অনেক খরচ। কিছু পয়সা যদি দিতেন!’
তিনি খেপে উঠে বললেন— ‘কবি আবু মুসা চৌধুরীর স্টলে কাজ করার চান্স পাইছো, এরচেয়ে বেশি পাওনা আর কী আছে? রাতারাতি বিখ্যাত হয়া যাবা। আমার সাথে কাজ করলেই ওয়ার্ল্ড নিউজ হয়!’
ওয়ার্ল্ড নিউজ!
ওনার সাথে কাজ করলে বিশ্বসংবাদ হবে— এ আশ্বাসের উপর ভরসা করতে পারছি না। তাই মরিয়া হয়ে বললাম— ‘স্টল সাজাতে তো অনেক খরচ…।’
তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—
‘এত বড় দায়িত্ব মাগনা দিছি, আর কিছু দিতে পারব না। আমার কাছে ফুটা পয়সাও নাই। যা যা লাগে জোগাড় করো।’
খোকন করুণ মুখে বলল— ‘অন্তত দুপুরে খানার টাকাটা দেন।’
মুসা ভাই ফিচেল হাসি হেসে বললেন— ’বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়া যাও। দেখো না, তারা থালা হাতে ভিক্ষান্ন জোগাড় করে। তোমরাও খিদা লাগলে মেলায় পরিচিত কারো সামনে গিয়া করুণ মুখে হাত কচলাবা। কী হইছে জিজ্ঞাসা করলে বলবা— ‘খিদায় মারা যাইতেছি, কিন্তু টাকা নাই।’ তারপর খোকনের দিকে ঝুঁকে বললেন— ‘তুমি যেই কিউট ছেলে— মেয়ে তো মেয়ে, মেয়ের মাও পাগল হয়ে যাবে। কোনো মহিলার কাছে গিয়া হাত বাড়ায়া দিলেই খানার টাকা হাজির!’
মোটামুটি ভিক্ষাবৃত্তির পরামর্শ আর কী!
কী আর করা! আমরা স্টলের পার্টিশন দেওয়ার জন্য ছাপড়া জোগাড় করলাম। উপরে টাঙানোর জন্য শামিয়ানা ভাড়া করলাম। বসার জন্য দুটো টুলেরও ব্যবস্থা হলো। সাথে আরো কিছু মাল-সামানও কিনতে হলো।
এখন এই ছাপড়া-ফাপড়া, মাল-সামান নিয়ে মেলায় যেতে হবে। এদিকে রেস্ত খালি। ঠেলাগাড়ি ভাড়া করার টাকা নাই। শেষ পর্যন্ত একটা রিকশা ভাড়া করলাম। সে রিকশায় মাল-সামান শামিয়ানা, টুল, ছাপড়া উঠানোর পর আর জায়গা নাই।
রিকশাওয়ালা সব দেখে বললেন, ‘ভাইজান, সিটে তো জায়গা নাই। একজন হাঁটাপথ ধরেন, আরেকজন মাল-সামান টাইট কইরা ধইরা পাদানিতে বসেন। আমি কিন্তুক উড়াল দিমু। টাইট কইরা না বইলে এক লাফে ইন্ডিয়া গিয়া পড়বেন। তখন আমারে দোষ দিতে পারতেন না।’
ঠিক তখন খোকন বেইমানি করল! কঠিন কণ্ঠে বলল— ‘আমার একটা ইজ্জত আছে। রিকশার পাদানিতে বইসা আমি যামু না। বাসে যামু। তুই রিকশায় যা।’
আমি তাকে রিকশায় যেতে অনুরোধ করতেই সে কঠিন গলায় বলল— ‘মামলা ডিসমিস। আমি এই মেলাটেলায় নাই। খানা নাই, পয়সা নাই, মুসা ভাই কয় ভিক্ষা করতে— তার উপর তুই মালপত্র ঝাপ্টায়া রিকশার পাদানিতে বইসা যাইতে কস! আমি গেলে বাসে যামু, নইলে বাদ। তুই একা মেলা সামলা।’
ও চলে গেলে আমার সমূহ বিপদ! তাই কথা না বাড়িয়ে আমি রিকশায় যেতে রাজি হলাম।
অতঃপর চট্টগ্রামের উদীয়মান তরুণ কবি বাদল সৈয়দ ত্রিভঙ্গ অবস্থায় রিকশার পাদানিতে বসে বেড়ার ছাপড়া জড়িয়ে ধরে মুসলিম হলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
ভালোই যাচ্ছিলাম, সমস্যা হলো কদমতলি রেল ক্রসিংয়ে। ট্রেন যাবে তাই রাস্তা বন্ধ। রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ পাশ থেকে শুনি, কে যেন মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করছে— ‘বাদল, কমোডে বসার ভঙ্গিতে বসে কই যাও? ছাপড়া বিছায়া ছাগল জবাই করবা? কারো বিয়াতে ছাগল সাপ্লাইয়ের কন্টাক্ট নিছো বুঝি?’
তাকিয়ে দেখি আমাদের বিখ্যাত বলিউড নায়িকা সুরভী পাশের রিকশায় বসে আছে। তার হাসি কান পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
আমি ছাপড়া জড়িয়ে ধরে নায়িকার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
একটু পর ট্রেন চলে গেলো— ব্যারিয়ার তুলে নেওয়া হলো। আমার রিকশা চলতে শুরু করেছে। সুরভীর রিকশাও। সেটি আমাকে পাশ কাটানোর সময় সে গলা লম্বা করে বলল— ‘রিকশায় ছাপড়া নিছো, ছাগল কই? ওইটাকেও সাথে নিতা। দুইজনে গল্প করতে করতে যাইতে পারতা।’
বলিউডের এ নায়িকা পরে আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিলো। এখনো তাই আছে।

#আসুন মায়া ছড়াই

 

May be an image of one or more people, people smiling and jewellery


এ জাতীয় আরো খবর...