জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এবং লাগাতার তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের মুখে পড়েছে। স্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ গবেষণাপত্র ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬’ প্রতিবেদনে দেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধ্বংসাত্মক ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতির এক ভয়ঙ্কর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে কেবল তীব্র গরম বা অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে বিগত ২০২৫ সালে এক বছরেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য আয় বা শ্রমমূল্য থেকে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
গত ১ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত এক জাতীয় অনুষ্ঠানে এই চাঞ্চল্যকর গবেষণা প্রতিবেদনটির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিট বা সিসিএইচপিইউর কারিগরি সহায়তায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ বা সিথ্রিইআর এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে পরিবেশ অর্থনীতিবিদ সৌর দাশগুপ্ত জানান যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার ওপর যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা গত এক দশকে অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অতিরিক্ত গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে দুই হাজার ছয় শ কোটিরও বেশি সম্ভাব্য শ্রমঘণ্টা চিরতরে নষ্ট হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকের বার্ষিক গড় হিসাবের তুলনায় বর্তমান এই শ্রমঘণ্টা হ্রাসের হার প্রায় একাত্তর শতাংশ বেশি। বিশেষ করে তীব্র রোদ ও চরম গরমের মধ্যেও দেশের খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষ, কৃষিজীবী ও দিনমজুরদের বাধ্য হয়ে ঘরের বাইরে উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে হয়, যা তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও আয় রোজগারকে মারাত্মকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
বয়স্ক এবং শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গত কয়েক বছরে নবজাতক শিশু ও প্রবীণ নাগরিকদের তাপপ্রবাহের কবলে পড়ার হার ১৯৮৬ থেকে ২০০৫ সালের ঐতিহাসিক গড় হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এক বছরের কম বয়সি শিশুরা বছরে গড়ে প্রায় সাত দিন এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণরা বছরে সাড়ে সাত দিনেরও বেশি সময় তীব্র তাপপ্রবাহের চরম শিকার হয়েছেন, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি বয়সি প্রবীণ নাগরিকদের অতিরিক্ত গরমে মৃত্যুর ফলে দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই লক্ষ ষোলো হাজার মানুষের এক বছর সম্পূর্ণ আয়ের সমান এবং ২০০০ থেকে ২০০৪ সালের গাণিতিক গড়ের তুলনায় বর্তমান এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। অন্যদিকে বায়ুদূষণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিষাক্ত ধোঁয়া দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদকে তিলে তিলে গ্রাস করে ফেলছে, যার আর্থিক মূল্য জাতীয় অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলছে।
মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্টি হওয়া অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা বা পিএম দুই দশমিক পাঁচ মাত্রার বায়ুদূষণের কারণে ২০২৩ সালে বাংলাদেশে আনুমানিক দুই লক্ষ ঊনচল্লিশ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এই বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর হার সামগ্রিকভাবে প্রায় চল্লিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেবল ২০২৩ সালেই সংঘটিত এই মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রায় সাড়ে ৩৭ শতাংশের জন্য সরাসরি দায়ী ছিল বিভিন্ন শিল্পকারখানা ও যানবাহনে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি। এর পাশাপাশি গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত বায়ুদূষণের কারণেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।
বায়ুদূষণের কারণে ঘটে চলা এই অকালমৃত্যু এবং অসুস্থতার পেছনে যে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি রয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক জিডিপির প্রায় ষোলো শতাংশের সমান। একই সময়ে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণের তীব্রতা প্রায় দশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরকার ২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে প্রায় পাঁচ দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার নিট ভর্তুকি প্রদান করেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, জীবাশ্ম জ্বালানিতে দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির আর্থিক পরিমাণ দেশের তৎকালীন মোট স্বাস্থ্য বাজেটের প্রায় তিপ্পান্ন শতাংশের সমান, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার নীতিমালার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানবদেহের সুস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। তাপপ্রবাহ যেভাবে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে খেটে খাওয়া মানুষ এবং গর্ভবর্তী মা ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ছেন। প্রখ্যাত পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে বর্তমান ধারা অব্যাহত রয়েছে, তাতে এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় সাড়ে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক আইনুন নিশাত আরও বলেন যে ল্যানসেট কাউন্টডাউনের এই প্রতিবেদন নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করে দিলেও সরকারের যেকোনো পদক্ষেপ অবশ্যই দেশের স্থানীয় আবহাওয়া ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিশুদের সঠিক পুষ্টির জোগান দেওয়া এবং মশাবাহিত বা ভেক্টর-বর্ন বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধের বিষয়গুলোকে সামনে রেখে অবিলম্বে ‘হেলথ ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান’ বা স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনভিত্তিক ল্যানসেট কাউন্টডাউনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মারিনা রোমানেলো আন্তর্জাতিক মতামতে জানিয়েছেন যে পরিচ্ছন্ন শক্তির ব্যবহারে কিছু অগ্রগতি হলেও বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যক্ষতি যে হারে বাড়ছে, তার মোকাবিলার প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত।
জিএসসিসি-র গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ লিড তাহরিম আরিবা চৌধুরীও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হক জানিয়েছেন যে ল্যানসেটের এই ২০২৬ সালের গবেষণা প্রতিবেদন দেশের নীতিনির্ধারক মহলে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার তাগিদকে আরও জোরালো করবে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহারের প্রতি জোর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে স্বাস্থ্যখাতের এই ক্রমবর্ধমান চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হয়।
সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এই বহুমুখী ও অবধারিত সংকট মোকাবিলা করতে হলে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা বা খণ্ডিত নীতি গ্রহণ করলে চলবে না। রাষ্ট্রীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও জলবায়ু অভিযোজন খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল আগামী প্রজন্মকে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ উপহার দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডেইলি স্টার ও সমকাল