বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত এবং বহুল প্রচলিত নাশতা চিড়ার পুষ্টিগুণ ও বিশুদ্ধতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের খোলাবাজার এবং বড় বড় সুপারশপ থেকে সংগৃহীত চাল ও চিড়ার নমুনায় লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে সক্ষম একধরনের ভয়ংকর ছত্রাকজাত রাসায়নিক পদার্থ আফলাটক্সিনের বিপজ্জনক উপস্থিতি ধরা পড়েছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘টক্সিকোলজি রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক তথ্যবহুল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই আশঙ্কাজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশের খুচরা বাজারে বিক্রি হওয়া চাল ও চালজাত পণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি: খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে আফলাটক্সিনের সংস্পর্শ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির মূল্যায়ন’, যেখানে নগরবাসীর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার প্রধানতম উপাদানের মারাত্মক দূষণের বাস্তব চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের অপরিহার্য খাদ্য উপাদানে এই বিষাক্ত উপাদানের বিস্তৃতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। পরীক্ষায় ঢাকার বাজার থেকে সংগৃহীত চালের নমুনার শতকরা ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং চিড়ার নমুনার শতকরা ৫৫ শতাংশের মধ্যেই আফলাটক্সিনের সুস্পষ্ট অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ বাজারের প্রতি চারটি চালের নমুনার একটিতে এবং প্রতি দুটি চিড়ার নমুনার একটিতেই এই বিষাক্ত ছত্রাকের বিষ ছড়িয়ে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ক্রেতারা বাজার থেকে যে খাদ্য উপাদান নির্দ্বিধায় কিনে ঘরে নিচ্ছেন, তা প্রকারান্তরে নীরব এক বিষবাষ্প বয়ে নিয়ে আসছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, আফলাটক্সিন কোনো কৃত্রিম রাসায়নিক কীটনাশক নয়, বরং এটি নির্দিষ্ট প্রজাতির ক্ষতিকর ছত্রাক দ্বারা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত অত্যন্ত বিপজ্জনক এক জৈব রাসায়নিক বিষ। আমাদের দেশের মতো ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে উচ্চ তাপমাত্রা এবং অতিরিক্ত আর্দ্রতাপূর্ণ আবহাওয়া এই ধরনের ছত্রাক বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে ফসল কাটার পর খাদ্যশস্য যথাযথ নিয়মে রোদে শুকানো না হলে কিংবা আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা হলে সেখানে অ্যাসপারজিলাস প্রজাতির ছত্রাকের বিস্তার ঘটে, যা খাদ্যশস্যের ভেতরে আফলাটক্সিন তৈরি করে। চাল ও চিড়ার মতো শুষ্ক পণ্যেও অবৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ পদ্ধতির কারণে এই বিষাক্ত উপাদানটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
মানবদেহের ওপর আফলাটক্সিনের দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া অত্যন্ত মারাত্মক ও জীবনঘাতী হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে এই বিষাক্ত উপাদানের ধারাবাহিক প্রবেশ সরাসরি যকৃৎ বা লিভারের কার্যক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে লিভার সিরোসিসের মতো দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে। শুধু তাই নয়, মানবদেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেমকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয় এই বিষ, যার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি যেকোনো সাধারণ রোগবালাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এই বিষের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও বেশি সংবেদনশীল এবং ধ্বংসাত্মক হতে পারে।
যদিও গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন যে সংগৃহীত নমুনাগুলোতে আফলাটক্সিনের তাৎক্ষণিক উপস্থিতি নির্ধারিত আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসীমার নিচেই অবস্থান করছে, তবুও চিকিৎসকরা একে মোটেও স্বস্তিদায়ক মনে করছেন না। গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে বর্তমান মাত্রা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তীব্র বিষক্রিয়া সৃষ্টি করবে না, কিন্তু ভাত যেহেতু বাঙালির প্রধান খাদ্য এবং দিনে অন্তত দু-তিনবার গ্রহণ করা হয়, তাই দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ভেতরে এর সঞ্চয়ন ধীরে ধীরে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পানির মতো দৈনন্দিন প্রধান খাদ্যের সামান্যতম দূষণও দীর্ঘকালে মানবদেহের জন্য এক নীরব মারণাস্ত্র হয়ে ওঠে।
খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে তা সুনির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করতে গবেষকরা আধুনিক বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ‘মার্জিন অব এক্সপোজার’ বা এমওই সূচক ব্যবহার করেছেন। আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ডে এই এমওই সূচকের মান যত বেশি হয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি তত কম বলে বিবেচনা করা হয়। সাধারণভাবে কোনো খাদ্য উপাদানে এমওই মান যদি দশ হাজারের নিচে নেমে আসে, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু ঢাকার চাল ও চিড়ার ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় যে সূচক মান পাওয়া গেছে, তা রীতিমতো আতঙ্কজনক।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত চালের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের এমওই সূচকের মান পাওয়া গেছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৬ এবং কোমলমতি শিশুদের ক্ষেত্রে এই মান আরও ভয়ংকরভাবে নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৮৯-এ। অন্যদিকে চিড়ার নমুনার ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের এমওই মান পাওয়া গেছে ৩ হাজার ৭৭১ দশমিক ৪০ এবং শিশুদের ক্ষেত্রে মাত্র ১ হাজার ৫ দশমিক ৭১। চাল ও চিড়া উভয় ক্ষেত্রেই প্রাপ্ত এই সূচকের মান নির্ধারিত আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমা দশ হাজারের চেয়ে বহু গুণ নিচে অবস্থান করছে, যা প্রমাণ করে যে রাজধানীর মানুষ প্রতিদিন অবচেতনভাবেই এক মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির ভেতর দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে এই সূচকের মান প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়েও অনেক কম হওয়ার বিষয়টি চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের জন্য আরও বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। শিশুদের শরীরের ওজন কম থাকা এবং তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও বিপাকীয় ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিণত না হওয়ার কারণে আফলাটক্সিনের সামান্যতম বিষও তাদের শারীরিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতিসাধন করতে পারে। চিড়া সাধারণত শিশু ও অসুস্থদের সহজপাচ্য পুষ্টিকর পথ্য হিসেবে খাওয়ানো হয়, অথচ সেই চিড়াতেই ৫৫ শতাংশ নমুনায় বিষাক্ত উপাদানের সন্ধান পাওয়া সামগ্রিক শিশুস্বাস্থ্যের জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা।
দেশের বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মোশতাক হোসেন পুরো বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে চালে আফলাটক্সিন কেন এবং কোন ধাপে তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করার জন্য অবিলম্বে আরও বড় পরিসরে গবেষণা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে ফসল তোলার পর প্রচলিত অনুন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং গুদামজাতকরণের ত্রুটি এই ছত্রাক সংক্রমণের অন্যতম প্রধান কারণ হতে পারে। দূষণের মাত্রা এখনও হয়তো আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছায়নি, কিন্তু বিষয়টিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া বা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে কেবল উৎপাদন পর্যায়ে নজরদারি বাড়ালেই চলবে না, বরং মাঠ থেকে কৃষকের গোলা, পাইকারি আড়ত, চালকল এবং শহরের খুচরা বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে একটি মানসম্মত তদারকির আওতায় আনতে হবে। ধান কাটার পর সঠিক মাত্রায় আর্দ্রতা দূর করার জন্য আধুনিক ড্রায়ার ব্যবহার এবং গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এছাড়া পলিথিন বা প্লাস্টিকের বায়ুরোধী বস্তার পরিবর্তে পাট বা স্বাস্থ্যসম্মত মোড়ক ব্যবহার করার বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত, যাতে সংরক্ষণাগারে কোনোভাবেই ছত্রাকের বিস্তার ঘটতে না পারে।
ভোক্তা অধিকার এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল তদারকি জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে খাদ্য গবেষকরা বলেছেন যে সুপারশপ থেকে শুরু করে ফুটপাতের খোলা দোকান পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের নিয়মিত ল্যাব টেস্ট করা প্রয়োজন। যেসব ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানের পণ্যে বারবার ক্ষতিকর উপাদানের প্রমাণ মিলবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সাধারণ কৃষক ও মিলমালিকদের খাদ্যশস্য শুকানো ও সঠিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা অপরিহার্য।
সার্বিকভাবে বলা যায় যে ভাতের থালায় এই অদৃশ্য বিষের উপস্থিতি দেশের সমগ্র জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক বড় ধরনের সতর্কসংকেত বাজিয়ে দিয়েছে। সরকার, গবেষক, চালকল মালিক এবং সাধারণ জনগণ সম্মিলিতভাবে সচেতন না হলে এই নীরব বিষক্রিয়া আগামী প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিতে পারে, যা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
তথ্যসূত্র: আমার দেশ