বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন সব সময়ই এক বিশেষ আবেগের নাম। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সেই একই উন্মাদনা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এই উন্মাদনার আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু গভীর ক্ষত ও দুশ্চিন্তার ভাঁজ। আমাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মাঠ পর্যায়ের রাজনীতির অস্থিরতা, নির্বাচনি আচরণবিধির অবাধ লঙ্ঘন, এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষার এক মিশ্র চিত্র।
১. আচরণবিধির আড়ালে: আইন যেখানে কেবল কাগজের দস্তাবেজ
নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রতিবারই কঠোর সব নিয়মকানুন জারি করে। এবারের নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাঠ পর্যায়ে এসব বিধিনিষেধ মানার চেয়ে ভাঙার প্রতিযোগিতাই যেন বেশি তীব্র।
রাজধানীসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীরা ডিজিটাল রঙিন পোস্টার ও ব্যানারে শহর ছেয়ে ফেলেছেন। নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারণায় সাদা-কালো পোস্টার ব্যবহারের কথা থাকলেও, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রার্থীরা যেন রঙিন আভিজাত্য প্রদর্শনেই বেশি আগ্রহী। শুধু রঙিন পোস্টারই নয়, ব্যানার ও ফেস্টুনের আকারেও নেই কোনো লাগাম। অনেক স্থানে দেখা গেছে, জনচলাচলের ফুটপাত এমনকি মূল সড়কের ডিভাইডার দখল করে বড় বড় তোরণ ও নির্বাচনী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
প্রশাসন মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করছে ঠিকই, কিন্তু সেই জরিমানার অঙ্ক প্রার্থীদের বিশাল নির্বাচনী বাজেটের তুলনায় এতটাই নগণ্য যে, এতে আইন মানার কোনো তাগিদ তৈরি হচ্ছে না। আমাদের অনুসন্ধানী দল দেখেছে, দিনের বেলা জরিমানা দিয়ে আসার পর রাতেই আবার একই স্থানে নতুন রঙিন ব্যানার টাঙানো হচ্ছে। আইনের প্রতি এই উদাসীনতা একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য চরম অশনিসংকেত।
২. অসহিষ্ণুতা ও সংঘাত: গণতন্ত্রের পিঠে বিঁধছে তীর
একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রধান অনুষঙ্গ হলো ‘পরমতসহিষ্ণুতা’। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপটে এর তীব্র অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট দল বা জোটের প্রার্থীদের ওপর বড় রাজনৈতিক দলের কর্মীদের হামলা ও হেনস্থার ঘটনা নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর বারবার ডিম নিক্ষেপ এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। একজন প্রার্থী যখন স্বাধীনভাবে ভোটারদের কাছে যেতে পারেন না, তখন সেই নির্বাচনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, প্রচার মাইক ভাঙচুর এবং কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানোর খবর আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই ‘পেশিশক্তির রাজনীতি’ সাধারণ ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে।
৩. ব্যক্তিগত কুৎসা বনাম উন্নয়ন পরিকল্পনা
নির্বাচনের প্রধান আকর্ষণ হওয়ার কথা ছিল দলগুলোর ইশতেহার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন ‘নেতিবাচক প্রচারণা’ বা একে অন্যের চরিত্র হনন করার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে।
আমাদের বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নির্বাচনি জনসভাগুলোতে প্রার্থীরা তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে ধরনের শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করছেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই সুরুচির সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একে অন্যের ব্যক্তিগত জীবন বা অতীত নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি করতে গিয়ে প্রার্থীরা ভুলে যাচ্ছেন যে, তারা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। জনগণের মূল সমস্যা—যেমন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বেহাল দশা—এসব নিয়ে প্রার্থীরা যতটা না সরব, তার চেয়ে অনেক বেশি সরব একে অন্যকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘দুর্নীতিবাজ’ প্রমাণ করার লড়াইয়ে।
৪. ভোটারদের নীরব আর্তনাদ ও আকাঙ্ক্ষা
তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে আমাদের অনুসন্ধানে এক গভীর হতাশাজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ভোটাররা মনে করেন, নির্বাচনের সময় তারা কেবল ভোটের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হন। নির্বাচন শেষ হয়ে গেলে প্রার্থীদের আর দেখা যায় না।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন আর কেবল বড় বড় ফ্লাইওভার বা মেগা প্রজেক্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তারা চান জীবনের মৌলিক সমস্যার টেকসই সমাধান। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবার—সবার মাঝেই এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছে। আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেখতে চান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইশতেহারে অনেক চাকচিক্যময় কথা থাকলেও সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার কোনো স্পষ্ট রোডম্যাপ অধিকাংশ প্রার্থীর কাছেই নেই।
৫. ডিজিটাল প্রচারণা ও অপপ্রচারের দ্বৈরথ
প্রযুক্তির প্রসারের সাথে সাথে এবার নির্বাচনি প্রচারণায় সোশ্যাল মিডিয়া এক বিশাল ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই মাধ্যমটির অপব্যবহার আমাদের অনুসন্ধানে এক নতুন উদ্বেগের কারণ হিসেবে ধরা দিয়েছে।
ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে প্রার্থীরা যেমন নিজেদের ইতিবাচক প্রচার করছেন, তেমনি বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে ‘পেইড ট্রল আর্মি’। এরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো এবং এডিট করা ভিডিও বা ছবি ছড়িয়ে দিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই ডিজিটাল সন্ত্রাসবাদ নির্বাচনের পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। নির্বাচন কমিশনের সাইবার মনিটরিং সেল থাকলেও তারা এই বিশাল সাইবার জগতের অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে।
৬. নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও সীমাবদ্ধতা
সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে কমিশন কঠোর হওয়ার চেষ্টা করলেও স্থানীয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে কেবল নোটিশ প্রদান বা সামান্য জরিমানা পর্যাপ্ত নয়। কঠোর আইনি ব্যবস্থা বা প্রার্থিতা বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত প্রভাবশালী প্রার্থীরা আইন ভাঙার খেলায় লিপ্ত থাকবেই।
৭. আগামীর পথ: একটি সুস্থ ধারার প্রত্যাশা
বর্তমান প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ না করে রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আমাদের অনুসন্ধানের শেষে যে সারমর্ম দাঁড়িয়েছে তা হলো:
রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বাদ দিয়ে গঠনমূলক ইশতেহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনকে দন্তহীন বাঘের মতো নয়, বরং সত্যিকারের শক্তিশালী ও স্বাধীন সংস্থা হিসেবে কাজ করতে হবে।
সহিংসতা বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
ভোটারদের জন্য একটি নিরাপদ ও নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা, নির্বাচন মানে কেবল জয়-পরাজয় নয়, বরং এটি জনগণের আস্থার প্রতিফলন। যদি এই আস্থার সংকট দূর না হয়, তবে গণতান্ত্রিক ভিত্তি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়বে। প্রার্থীরা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল না হন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে আইন মানার আশা করা বৃথা। বাংলাদেশের আগামীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং প্রার্থীদের আচরণের ওপর।