ইরান বনাম ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের তিন দিন অতিবাহিত হওয়ার পর রণক্ষেত্রে এক অদ্ভুত সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। সামরিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে তেল আবিব ও ওয়াশিংটন অভাবনীয় সাফল্য পেলেও, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর কুয়াশা। পেন্টাগন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধের ময়দানে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজ হলেও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমাপ্তি (Endgame) এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে।
হামলার শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের অবশিষ্ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দিয়েছে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। এর ফলে পারস্যের আকাশে এখন শত্রুবিমানের একচ্ছত্র রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত। তবে সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে নেতৃত্বের ওপর। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ ৪৮ জন নেতা নিহত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর এমন ভয়াবহ নেতৃত্বশূন্যতার মুখে আর কখনো পড়েনি ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, বর্তমানে তাদের সামরিক ইউনিটগুলো কোনো কেন্দ্রীয় কমান্ড ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।
ইরানের সংবিধানে খামেনির অবর্তমানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠনের বিধান থাকলেও বর্তমানে তাদের কাউকেই জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে না। ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু এবং খামেনি-পুত্র মোজতাবার সাথে আইআরজিসি-র অমীমাংসিত সম্পর্কের কারণে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কোনো স্পষ্ট নেতা না থাকায় ইসলামিক রিপাবলিকের ভিত্তিই এখন প্রশ্নের মুখে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্ময়কর মোড় হলো ইরানের পাল্টা আঘাতের ধরণ। তেহরান সরাসরি সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো দেশগুলোর বেসামরিক স্থাপনা ও হোটেলে হামলা চালিয়েছে। এর ফলে যে দেশগুলো নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছিল, তারা এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জোটে যোগ দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানিও এই জোটে যোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ইরানকে বিশ্বজুড়ে আরও একা করে ফেলেছে।
রাশিয়া ও চীন ইরানের ‘কৌশলগত অংশীদার’ হলেও খামেনির মৃত্যুর পর তাদের ভূমিকা কেবল মৌখিক নিন্দার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রাশিয়া নিজেই আকাশ প্রতিরক্ষা সংকটে ভুগছে, আর চীন কেবল সস্তা তেলের চিন্তায় ব্যস্ত। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ঝুঁকি কম।
সামরিকভাবে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখলেও হোয়াইট হাউসের মূল দুশ্চিন্তা হলো যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে। যদি ইরানি জনগণ বর্তমান শাসনের অবশিষ্টাংশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং সরকার তা দমনে শক্তি প্রয়োগ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে কি না— সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। পেন্টাগন মনে করছে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব যদি পুনরায় কঠোর পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান নেয়, তবে এই সংঘাত এক অন্তহীন যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।